বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতিমধ্যে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি করেছে। এবার রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের বহরে বৈচিত্র্য আনতে যুক্ত হচ্ছে আরেও ১০টি এয়ারবাস। বুধবার ঢাকায় এয়ারবাসের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ব এ কোম্পানির চুক্তি হতে যাচ্ছে।
নতুন ১০টি উড়োজাহাজের দাম এখনো বিমান প্রকাশ করেনি। তবে বিমানের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০৫ কোটি মার্কিন ডলারে চুক্তি হতে যাচ্ছে। তবে বিমান দরকষাকষি করে তা ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারে নামিয়ে আনতে কাজ করছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, ১০টি উড়োজাহাজ আগামী ২০৩৩ সাল থেকে বহরে যুক্ত হওয়া শুরু করবে। পরবর্তী ৪ বছর ধরে একে একে সবগুলো এয়ারবাস বহরে যুক্ত হবে। চুক্তি অনুযায়ী চারটি এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ ও ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারো বডি জেট যুক্ত হবে।
বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোয়িং কিংবা এয়ারবাস কেনায় ব্যবসায়িক বিবেচনার চেয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বোয়িং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি। অন্যদিকে, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের কনসোর্টিয়াম কোম্পানি এয়ারবাস। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বোয়িংকে বাদ দিয়ে যখন এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনা চুড়ন্ত হয়েছিল, তখন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বোয়িং বেচতে তৎপর হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের কারণে বোয়িং কেনাই চুড়ান্ত হয়।
বোয়িংয়ের দিকে যখন বিগত অন্তবর্তী সরকার ঝুঁকে পড়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও বসে থাকেনি। ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতেরা গত বছরের ৪ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে বিমানকে বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করতে বলেন।
ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে গত ২২ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিক্যাবের অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে এয়ারবাস থাকা তাদের (বিমানের) নিজেদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ও সুবিধাজনক ছিল। বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থা দুই ধরনের উড়োজাহাজই তাদের বহরে রাখে। দুই ধরনের উড়োজাহাজের সুবিধা তুলনা করে বেছে নেওয়া যায়।
তিনি বলেন, যৌক্তিক ও কারিগরি কারণে বিমান এয়ারবাসকে বেছে নিয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়।
বোয়িংয়ের এক সমীক্ষা বলছে, বিমান এয়ারবাস কিনলে ২০ বছরে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে। বিমান ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দিয়ে যাত্রী পরিবহন করে বছরে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি লাভ করবে। কারণ, ড্রিমলাইনারের জ্বালানি ব্যয় ৬ শতাংশ কম, রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম ৩০ শতাংশ। সেই সঙ্গে বোয়িংয়ের দামও বিশ্ব বাজারে উড়োজাহাজ নির্মাতা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম।
যদিও একটি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের এই সমীক্ষা কতটা নিরপেক্ষ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খাত সংশ্লিষ্টরা। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম টেকনিক্যাল ইভালুয়েশন কমিটি ৬ মাস ধরে সমীক্ষা শেষে জানিয়েছিল, নতুন এয়ারবাসে বিমানের অতিরিক্ত খরচ হবে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এদিকে, বিমানের ১৫ বছরের বেশি বোয়িং উড়োজাহাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতার পর কেন আবার এয়ারবাসে যেতে হচ্ছে তা নিয়েও বিমানের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে টাইমসকে বলেন, যেসব এয়ারলাইন্সের বহরে ৫০টির নিচে উড়োজাহাজ রয়েছে তাদের পক্ষে মিশ্র বহরে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করা কঠিন।
এক কর্মকর্তা বলেন, এয়ারবাসের খুচরা যন্ত্রাংশের দাম অনেক বেশি। শুধু উড়োজাহাজ আনলেই হবে না, এই বিশাল বহরের এয়ারলাইন্সকে পরিচালনা করতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হবে। বিমানের সেই ধরনের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, মিশ্র বহর বা মিক্সড ফ্লিট খারাপ নয়। তবে বিমান যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বোয়িং কেন্দ্রিক ফ্লিট পরিকল্পনা ভালো জানে, তাই তাদের জন্য বোয়িং থাকাটাই বেশি লাভজনক ছিল। নতুন করে কোনো কিছু শেখা, জানা, প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতো না।
বোয়িংয়ের পাইলট, সিমুলেটর প্রশিক্ষণ কম জটিল। কারণ, তাদের নতুন ধরনের উড়োজাহাজের প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে না। তেমনিভাবে প্রকৌশলীদের জন্য বিদ্যমান প্রশিক্ষণেই উড়োজাহাজ মেরামত করা সম্ভব। খুচরা যন্ত্রাংশ (স্পেয়ার পার্টস) একই ইকোসিস্টেমে পাওয়া যাবে। ক্রু ম্যানেজমেন্ট, ফ্লিট ম্যানেজমেন্টও সহজ হবে।
অন্যদিকে, এয়ারবাস আসলে দুই ধরনের ইকোসিস্টেমে যেতে হবে। দুই ধরনের উড়োজাহাজ হলে ক্রু ম্যানেজমেন্ট ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট জটিল হবে। তা ছাড়া কোনো একটি রুটে বোয়িংয়ের একটি মডেলের উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। হঠাৎ করে সেখানে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করা যাবে না।
দীর্ঘ ৩০ বছর বিমানের মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করে অবসরে যাওয়া ফারুক আহমেদ টাইমসকে বলেন, বিমানের মিশ্র বহরের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। বোয়িং আসার আগে খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে ১৯৯৩ সালে বিমান দুটি নতুন এয়ারবাস এ৩১০ উড়োজাহাজ কিনেছিল। একই সময়ে বোয়িংয়ের ডিসি-১০ উড়োজাহাজও বহরে ছিল।
তবে সেই সময়ের মিশ্র বহরের সমালোচনা করে বর্তমান এক কর্মকর্তা বলেন, ওই সময় মিশ্র বহরের কারণে বিমান বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিতো। বর্তমান বোয়িংয়ের বহর যুক্ত হওয়ার পর বিমান লাভ করেছে। শুধু তাই নয়-প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ১৪টি বোয়িংয়ের টাকা বিমান নিজেই পরিশোধ করেছে। একটি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ারও ঘটনা নেই। লোকসানি প্রতিষ্ঠান হলে বিমানের পক্ষে হাজার হাজার কোটি টাকা দামের বোয়িংয়ের উড়োজাহাজের দাম পরিশোধ করা সম্ভব হতো না।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, মিশ্র বহর হলে খরচ বেশি এটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। কারণ বিমানে এর আগেও মিক্সড ফ্লিট ছিল। আবার মিক্স ফ্লিটে কিছু সুবিধাও রয়েছে। তাই একপাক্ষিক কোনো মন্তব্য করা সঠিক নয়।
নাম না প্রকাশের শর্তে আরেক কর্মকর্তা বলেন, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ একই কোম্পানির, ককপিট, ট্রেনিং ও ইকোসিস্টেম এক। ফলে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ আরো যুক্ত হলে পাইলট প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল প্রসিডিয়োর সবকিছু একই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতো।
বিমানের এক প্রকৌশলী নাম না প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন বোয়িং পরিচালনা করায় নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা তৈরি হয়েছে। এখন নতুন করে এয়ারবাস আনলে রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ, ডকুমেন্টেশন, স্পেয়ার পার্টস (খুচরা যন্ত্রাংশ) ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। সেই সাথে এয়ারবাসে ওভারহেড খরচ বেশি পড়বে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিমানের প্রথম টেকনিক্যাল কমিটি এয়ারবাসে ৬ মাস ধরে কাজের পর্যালোচনা করে এয়ারবাস কেনার বিপক্ষে মতামত দিয়েছিল।
পরবর্তীতে এই কমিটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটি বিমানের বহরে এয়ারবাস যুক্ত হলে তা লাভজনক বলে রিপোর্ট দেয়। দ্বিতীয় কমিটি বিমানের প্রতি ফ্লাইটে ৯২ শতাংশ কেবিন ফ্যাক্টর দেখিয়ে লাভ দেখিয়ে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। বাস্তবে বিমানের কেবিন ফ্যাক্টর ৭৬ শতাংশের নিচে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বহরে বোয়িং নাকি এয়ারবাস রয়েছে, তার চেয়ে বড় বিষয় এই বহরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। অতীতে বিমান যে ফ্লিট প্ল্যান অনুযায়ী বোয়িং কিনেছিল সেই অনুযায়ী তা পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়।
তিনি বলেন, ‘বিমানের ড্রিমলাইনার, বোয়িং ৭৭৭-৩০০ দুরপাল্লার উড়োজাহাজ দিয়ে স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের আর্থিক ক্ষতি করেছি।’


