দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আপসনামা দাখিলের পরও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করেছে আদালত।
বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর ইসলামের আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
শুনানিতে জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এটি একটি আলোচিত মামলা। ভিকটিমের একটি আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ঘটনার সূত্রপাত। ভিকটিমকে ন্যাম ভবনের বাসায় নিয়ে গেলেও তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়নি। বরং তাকে বারান্দায় ঘুমাতে দেওয়া হতো।’
তিনি বলেন, ‘এটি আপসযোগ্য মামলা নয়। বাদীপক্ষের করা আপসনামা গ্রহণে আদালত বাধ্য নয়। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। তদন্ত চলাকালে অনেক সময় মামলার বাদীও আসামির তালিকায় চলে আসেন। তাই তদন্তাধীন অবস্থায় আসামিকে জামিন দেওয়া উচিত নয়।’
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘যিনি আপসনামা করেছেন, তাকেও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। আব্দুল হামিদ মোড়ল এ ধরনের আপস করার এখতিয়ার রাখেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার। মামলাটি তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না।’
তিনি বলেন, ‘তদন্তাধীন মামলায় বাদীপক্ষ জামিনে আপত্তি নেই—এমন আবেদন করার অধিকার রাখে না। কারণ এটি আপসযোগ্য মামলা নয় এবং রাষ্ট্র এখানে বাদী। একজন মানুষ মারা গেছেন। যিনি সংবাদদাতা বা বাদী হিসেবে রয়েছেন, তার ভূমিকা মামলার তদন্তে বিবেচ্য বিষয়। ফলে আসামির জামিনের বিরোধিতা করছি।’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জামিনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে আপস হয়ে গেছে। তাই আসামিকে জামিন দেওয়া হোক। একই মামলার দ্বিতীয় আসামিকে যে বিবেচনায় জামিন দেওয়া হয়েছে, বর্তমান আসামি তার চেয়ে আরও ১২ বছর বেশি বয়সী এবং তারা পরস্পরের আত্মীয়। মামলা চলাকালে আসামিপক্ষ তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ভিকটিম অতি অল্পবয়স্ক ছিলেন এবং তিনি একজন বয়স্ক আসামির হেফাজতে থাকা অবস্থায় আত্মহত্যা করেছেন বলে মামলার অভিযোগে উঠে এসেছে। এ ছাড়া মামলায় রাষ্ট্র বাদী হওয়ায় বাদীপক্ষ আপসের ভিত্তিতে জামিনের আবেদন করলেও আদালত সেই আপসনামার ভিত্তিতে আসামিকে জামিন দিতে বাধ্য নয়। যদি আজকে জামিন দেওয়া হয় সমাজে একটা বিরুপ ধারণা তৈরি হবে। ফলে জামিন নামঞ্জুর করা হলো।
এর আগে একই মামলায় গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপসনামার শর্তে জামিন দেওয়া হয়।
আপসনামায় যা বলা হয়েছে
গত ২৯ সেপ্টেম্বর করা আপসনামায় মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেন, মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের প্ররোচনায় কিংবা তাদের কোনো কর্মকাণ্ডে রাগ বা অভিমানের কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি।
আপসনামায় বলা হয়, বাদী, গাজী নজরুল ইসলাম এবং আপসনামার দ্বিতীয়পক্ষের ব্যক্তি মো. আব্দুল হামিদ মোড়ল আগে থেকেই নিকট আত্মীয়। উভয় পক্ষের আত্মীয়স্বজনও পরস্পরের নিকটাত্মীয়। তাদের মধ্যস্থতায় আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে।
আপসের শর্তে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম জামিনে মুক্তি পেলে বাদী বা তার পরিবারের কারও কোনো আপত্তি থাকবে না। উভয়পক্ষ হৃদ্যতাপূর্ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে এবং বিচারাধীন বিষয়ে নির্লিপ্ত থেকে বিচারকাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
এই আপসনামার ভিত্তিতেই গাজী নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে আদালতে জামিনের আবেদন করা হয়। তবে রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতার মুখে আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করেন।
মামলার অভিযোগ ও রিমান্ড
মামলার নথি অনুযায়ী, মরিয়ম খাতুন ছিলেন গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যে ঢাকার ন্যাম ভবনে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে গাজী নজরুল ইসলামের ফোন পেয়ে বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে সেখানে যান মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।
মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনায় সন্দেহ থেকে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামসহ আরও একজনকে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন মরিয়মের বাবা।
মামলা হওয়ার পর গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে গাজী নজরুল ইসলামকে দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মাকছুদা ইসলামকেও এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।
আসামিপক্ষের জামিন আবেদনে দাবি করা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেও তাদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
এজলাস থেকে আসামী নামার সময় মরিয়মের বাবা বলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য আপস করেছি।


