মব: উপাচার্যকে পদত্যাগপত্রে সই করানোর পর বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

মব: উপাচার্যকে পদত্যাগপত্রে সই করানোর পর বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে তার কার্যালয়ে হেনস্থার ঘটনা ঘটে। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহা. জাওয়াদুল হকের কাছ থেকে মব করে পদত্যাগপত্রে সই করানোর যে ঘটনা ঘটেছে, উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সেটি বৈধ হওয়ার সুযোগ নেই।

গত মঙ্গলবারের এই ঘটনায় মামলার পর পুলিশ রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করেছে, পুলিশ ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে অন্যদের শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

প্রশ্ন রয়ে গেছে, কারা আগে থেকে পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করেছিল, কেন সেটি নিয়ে তারা উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়েছিল এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাকে পদত্যাগপত্রে সই করতে হলো?

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ লেখা ব্যানার নিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়টির অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রবেশ করে। তারা উপাচার্যকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়। একপর্যায়ে আগে থেকেই প্রস্তুত একটি পদত্যাগপত্র সামনে দেওয়া হয় এবং সেটিতে সই করানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই মবে দলে বিএনপি ও সহযোগী কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন রাজশাহীর রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ ও মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীম।

প্রত্যক্ষদর্শী একজনের দাবি, সাগর নামে এক ব্যক্তি আগে থেকে লেখা একটি পদত্যাগপত্র নিয়ে সেখানে যান। পরে সেটি হারুনুর রশিদের হাতে দেওয়া হয়। পরে উপাচার্যকে ওই পদত্যাগপত্রে সই করতে চাপ দেওয়া হয়।

এ সময় ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, আওয়ামী লীগের আস্তানা’ এবং ‘আওয়ামী লীগের ভিসি হুঁশিয়ার, সাবধান’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়।

উপাচার্য জাওয়াদুল হক অভিযোগ করেছেন, একপর্যায়ে তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে সই নিয়ে কক্ষটি তালাবদ্ধ করা হয়। যাওয়ার সময় তারা সিসিটিভির হার্ডডিস্ক ও কম্পিউটারের সিপিইউ নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

উপাচার্যের পিএস ও অর্থ বিভাগের সেকশন অফিসার মো. নাজমুল হোসাইন জানান, কয়েকজনের হাতে অস্ত্রসদৃশ বস্তু ছিল। তারা তাকে মারধর করে পোশাক ছিঁড়ে ফেলে এবং উপাচার্যের পাশাপাশি তার কাছ থেকেও পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়।

ঘটনার পরদিন বুধবার ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে এলেও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি। পরে তারা মানববন্ধন করেন।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই রাজপাড়া থানায় মামলা করেন নাজমুল হোসাইন। এতে কারও নাম উল্লেখ না করে ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলার পর বিএনপি নেতা আব্দুস সালামকে তার প্যারামেডিকেল এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ‘ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের এই কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলটির রাজশাহী মহানগর শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নজরুল হুদা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এটি দলীয় কর্মসূচি ছিল না। ‘ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মী সেখানে গিয়েছিলেন।

তার অভিযোগ, উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঠিকাদারি নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। উপাচার্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন শোনার দাবিও করেন তিনি।

গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আব্দুস সালাম জানান, তাঁতী দলের মহানগর সভাপতি কাজল, কৃষক দলের আহ্বায়ক শামীম, জিয়া মঞ্চের মহানগর সভাপতি কামাল ও হারুন তার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় তারা জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি।

মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজের ঠিকাদারি নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ ছিল, ঢাকার ঠিকাদারদের কাজের দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে উপাচার্য বলেছিলেন, একটি পক্ষ ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবে মব করে শিক্ষকদের পদত্যাগ করানোর ঘটনা ঘটেছে।

পদত্যাগে বাধ্য হয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ হাইকোর্টে রিট আবেদন করার পর গত ২০ আগস্ট আদালত তাকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি এভাবে জোরপূর্বক বা চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কোনো আইনি বৈধতা নেই বলেও রায় দেওয়া হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad