ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ক্লাসে নেকাব পরে আসায় এক ছাত্রীকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম তাসনিম সিরাজ মাহবুব। বুধবার বিভাগের মাস্টার্সের একটি ক্লাসে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (মৌলবাদী) ও সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাসনিম সিরাজের বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্লাস শুরু করার একটা পর্যায়ে আমি ওনার ডেস্কের বামে বসেছি। তারপর ওই শিক্ষক বলেন, “তুমি এখানে বসে থাকলে আমার আনকমফোর্টেবল ফিল হচ্ছে, আমার আনসেফ ফিল হচ্ছে। আমি চাচ্ছি যে তুমি ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসো।” এখন আমার কথা হচ্ছে আমি যদি বামে থেকেও উনাকে আনসেফ ফিল করাইতে পারি, ডান থেকেও আনসেফ ফিল করাইতে পারি, তাহলে ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসলেও তো উনি আনসেফ ফিল করতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তৃতীয়বার যখন উনি আমার দিকে তাকান, সরাসরি এড্রেস করে উনি বলা শুরু করেন যে, “মা, তোমাকে দেখে আমার আনকমফোর্টেবল ফিল হচ্ছে।” এরপরে উনি গ্র্যাজুয়ালি মুভ করেন যে আমি কেন এভাবে ড্রেসআপ করলাম, এটা কোন ফিকহে আছে, এটা ইসলামের কোথায় আছে। উনি বারবার রেফারেন্স দেন যে উনি হজ করে আসছেন, উনি সব জানেন এবং হজ করে যেহেতু আসছেন, ওখানে তো মুখ খুলে রাখাই যায়।’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর হয়ে ঘটনার সময় ওই ক্লাসে থাকা তার এক বান্ধবী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘ক্লাসের শুরুতে অভিযুক্ত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে নেকাব পরা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সামনে না বসে পেছনে বসতে বলেন তিনি। নেকাব পরা অবস্থায় ওই ছাত্রী তাকে অস্বস্তিতে ফেলছেন এবং মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে ওই শিক্ষার্থী এর প্রতিবাদ করেন। নেকাব কারো ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং এ কারণে কাউকে পেছনে বসতে বাধ্য করা উচিত নয় বলে যুক্তি দেন তিনি। এ নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে তার তর্ক হয়।
ঘটনার প্রতিবাদে প্রথমে ওই ছাত্রী এবং পরে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান। পরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করেন বলেও জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান, ক্লাসে এমন বর্ণবাদী ও কুৎসিত মন্তব্যের কারণে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার হুঁশিয়ারি দেন।
অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান তাজিন আজিজ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা মৌখিকভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেছি। শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্বেগ এবং ক্লাসে কী ঘটেছিল তা জানিয়েছে। আমরা বৈঠকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে আসব।’
এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার কমনরুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমার নেতৃত্বে ইংরেজি বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেয় এবং ৫ দফা দাবি তুলে ধরে। তাদের ৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে–ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিক্ষক তাসনিম সিরাফ মাহবূবকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছে তাকে নিদ্বির্ধায় ক্ষমা চাইতে হবে, তাকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মূল্যায়ন ও পাঠদান থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন এ ঘটনায় একাডেমিক ক্ষতি, হয়রানি বা প্রতিহিংসার শিকার না হন তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রো-উপাচার্য আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী টাইমসকে বলেন, ‘আমি গতকাল ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলি এবং তিনি আমাকে বলেন যে, মৌখিকভাবে অভিযোগ দিয়েছে এ প্রেক্ষিতে উনারা ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু, আমি তাদের লিখিত অভিযোগ নিতে বলেছি এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এটা বিভাগের একাডেমিক কমিটিতে আলোচনা করে আপনাদের সিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানান। আমি বিশ্বাস করি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং ক্লাসে লেকচার দেওয়ার সময় যেন কারো ধর্মীয় স্বাধীনতা বা কারো ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর আমরা এমন কোনো মন্তব্য না করি যাতে একটা পুরো ক্লাসের সমস্ত ছাত্রছাত্রী তার প্রতিবাদ করে। সংশ্লিষ্ট একাডেমিক কমিটির প্রস্তাবনা আসলে আমরা বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।
এরপর দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেত্রীরা।


