আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক এক বিচারকের শান্তিতে নোবেল জয়ের পর কয়েক ঘণ্টাও পেরোয়নি। এরই মধ্যে আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। শুক্রবার নেওয়া এমন পদক্ষেপে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধের মুখে পড়েছে ওয়াশিংটন।
আইসিসি এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে একে ‘আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মূল ভিত্তির ওপর আঘাত’ বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে আদালত রক্ষায় ব্যবস্থা নিতে এর ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বলে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে আইসিসি বলেছে, ‘আদালত একা টিকে থাকতে পারে না। যেসব রাষ্ট্র এটি প্রতিষ্ঠা করেছে, এর ভবিষ্যৎ এখন তাদের হাতের ওপরই নির্ভর করছে।’
যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করতে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আদালতের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই বৈরী মনোভাব দেখাচ্ছে। এর আগেও আদালতের কৌঁসুলি ও বিচারপতিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এবারের নিষেধাজ্ঞা আগের তুলনায় চেয়ে অনেক ব্যাপক। এর ফলে আদালতকে সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও শাস্তির মুখে পড়তে পারে।
নিষেধাজ্ঞায় ছয় মাসের অবকাশ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের অবকাশ রেখে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া কিছু ছাড় রাখা হয়েছে। এর আওতায় টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন পরিশোধ ও আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লেনদেন চালু রাখা যাবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আমেরিকানদের বিচার করতে দেবেন না।’
‘এ কারণেই এই আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আমরা এই বেপরোয়া আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করব, এর অর্থ ও অন্যান্য সম্পদের জোগান বন্ধ করব এবং কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা ক্ষীণ করে দেব।’
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগগুলো নিরসনের জন্য আদালত ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সুযোগ দিতে এভাবে নিষেধাজ্ঞা সাজানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে।
আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান রয়টার্সকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজ দুর্বল করতেই এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, ছয় মাসের সময়সীমা ‘আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে’। তবে ‘আইসিসি যাতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করার উপায় ইইউর হাতে রয়েছে’ বলেন তিনি।
আদালতকে সুরক্ষা দিতে ইইউর ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই আইনের মাধ্যমে বাইরের দেশের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
আইসিসি ৭০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাদের মধ্যে বিশ্বনেতা ও বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা রয়েছেন। নেতানিয়াহুর পাশাপাশি হামাসের নেতাদের গ্রেপ্তারও চেয়েছে আদালত। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও।
নোবেল ঘোষণায় রাজনৈতিক হামলার প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে এই আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেও অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্র আইসিসির প্রতি জোরালো সমর্থন প্রকাশ করেছে। এর সদস্যদের মধ্যে ইইউর সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া সামরিক জোট ন্যাটোর সব সদস্য রয়েছে। আদালতের সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে।
আইসিসির প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারির কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগের বিচারক ছিলেন।
নোবেল কমিটি স্পষ্টভাবে বলে, এমন এক সময়ে এ ধরনের আদালতগুলোর প্রতি সমর্থন জানাতে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে, যখন ‘বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক হামলার মুখে রয়েছে’।
কমিটি বলেছে, ‘যে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থায় যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় এবং নির্যাতনের শিকার মানুষেরা ন্যায়বিচার পান, তা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়লে সাধারণত মার্কিননির্ভর সব প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সংস্থাটির সঙ্গে কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাংকগুলো হিসাব, বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষা এবং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রথম মেয়াদেও এই আদালতের কর্মকর্তাদের ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।
যদিও আদালতের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে—এ আশঙ্কায় কয়েক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আইসিসির কর্মকর্তারা। তারা কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের বদলে সমজাতীয় ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করেছেন। ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছেন।


