যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে ডিজেল দেবে রাশিয়া: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে ডিজেল দেবে রাশিয়া: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে তার প্রশাসন।

শুক্রবার ট্রাম্প জানান, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়া ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে রাজি হয়েছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এর আগে ইউক্রেনে যুদ্ধে রুশ বাহিনীর অর্থের জোগান বন্ধের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে রুশ তেল কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। কাজেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় জ্বালানি বিক্রির মাধ্যমে মস্কোর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে চলমান যুদ্ধে অর্থায়নে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কৃষিকাজ, আসন্ন শীতে ঘর গরম রাখা এবং পণ্য পরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, কংগ্রেসে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না। সে পরিপ্রেক্ষিতে ডিজেলের উচ্চমূল্য ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ফলে নির্বাচনের আগে জনগণকে স্বস্তি দিতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িচালকদের সংগঠন আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশটিতে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়ায় ৬ ডলার ২৮ সেন্টে।

রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা আসার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগাম ডিজেল সরবরাহ চুক্তির বাজারে দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। এ সময় প্রতি গ্যালন ডিজেল ৪ ডলার ৬৪ সেন্টে লেনদেন হচ্ছিল।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমেরিকানদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো, বিশেষ করে আমাদের কৃষক, পশুপালক ও ট্রাকচালকদের স্বস্তি দেওয়া, আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

তবে বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানির দাম কমিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার ‘অত্যন্ত সফল’ আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। এই পরিমাণ ডিজেল প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলের সমান। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে।

আরও পড়ুন

পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মস্কো ও ওয়াশিংটনের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রশংসা করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত মাসে ওয়াশিংটন সফরের সময় দিমিত্রিয়েভ মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে রাশিয়ার সব বড় তেল কোম্পানিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।

এদিকে রুশ জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের উপায় খুঁজতে ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছে। ঠিক এসময়ই রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের চুক্তির ঘোষণা দিল ট্রাম্প প্রশাসন।

জেলেনস্কি এই সিদ্ধান্তকে ‘শক্তিশালী অংশীদারদের দুর্বল সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘পুতিনকে উপহার দিলে শান্তি আসবে না, সভ্য বিশ্বেরও কোনো উপকার হবে না বরং রাশিয়া আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে এই ডিজেলের প্রতিদান দেবে।’

আরও পড়ুন: ইউক্রেনে বড় হামলার হুমকি রাশিয়ার, বিদেশিদের কিয়েভ ছাড়ার আহ্বান

যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ডন বেকন বলেছেন, এখন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে কংগ্রেসে সম্প্রতি পাস হওয়া আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করার সময়।

এক্সে দেওয়া বার্তায় বেকন বলেন, ‘এখন পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এসব নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করা প্রয়োজন। ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হত্যা অব্যাহত রাখার মধ্যেই তার হাতে আরও অর্থ তুলে দিয়ে একজন স্বৈরশাসককে পুরস্কৃত করার সময় এটি নয়।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়ে একটি বিশেষ ছাড়পত্র জারি করেছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রাথমিক সরবরাহের পর আগামী নভেম্বরে রাশিয়া আরও পাঁচ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর ‘অবিলম্বে’ আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। রাশিয়ার তেল পরিশোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে আরও ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি।

অবশ্য ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বেশ কয়েকটি তেল পরিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটির ডিজেল উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই চুক্তি ডিজেলের দামে সাময়িক স্বস্তি আনলেও দীর্ঘ মেয়াদে দাম কমিয়ে রাখতে পারবে না।

জ্বালানি তেলের বাজারবিষয়ক গবেষক এবং কমোডিটি কনটেক্সট নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন এক্সে দেওয়া বার্তায় চুক্তিটির গুরুত্ব নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই চুক্তি যে কতটা গুরুত্বহীন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’

জনস্টনের মতে, রাশিয়া নতুন চুক্তিতে উল্লেখ করা পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশি ডিজেল রপ্তানি করতে সক্ষম। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিই প্রমাণ করছে ইউক্রেনের হামলায় তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জ্বালানি খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক জিম মিচেলও মনে করেন, এই উদ্যোগ ডিজেলের বাজারে সরবরাহসংকট পুরোপুরি কাটাতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘এটি স্পষ্টতই সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। তবে এটি হয়তো ঝিমিয়ে পড়া ডিজেলের বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর আরেকটি উৎস হিসেবে কাজ করবে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৭০ শতাংশ বেড়েছে। যা উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনেও অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad