চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে মুক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের মধ্যস্থতায় মঙ্গলবার) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বের করে আনা হয়। পরে অসুস্থ উপাচার্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেন জেলা প্রশাসক। তাদের দাবি ও অভিযোগ শোনার পাশাপাশি উপাচার্যের শারীরিক অবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। আলোচনার পর শিক্ষার্থীরা তাকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিতে সম্মত হন।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, উপাচার্য আর ক্যাম্পাসে ফিরবেন না—এমন শর্তেই তাকে যেতে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনাকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘আপনারা গণমাধ্যমে অনেক কথা বলেছেন। সেগুলো আমরা শুনেছি, দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, আপনারা যথেষ্ট পরিপক্বভাবে এবং সুন্দরভাবে আপনাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করেছেন। আমরা আশ্বস্ত হয়েছি।’
উপাচার্যের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একজন মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একজন বয়স্ক ও সম্মানিত ব্যক্তির চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমরা এসেছি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে চট্টগ্রামের একটি ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চাই।’
জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
চুয়েটের চলমান সংকট নিরসনে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘যেকোনো সংকটেরই সমাধান হতে হবে। কোনো সংকট তো আর মাসের পর মাস চলতে পারে না। সরকারের সঙ্গে আমরাও আলোচনা করছি। আমরা প্রত্যাশা করি, দ্রুতই সংকটের নিরসন হবে।’
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি পাওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক পর্যায়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে যোগাযোগের পাশাপাশি তিনি সাবেক উপাচার্য, শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গেও সমন্বয় করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে এবং চেষ্টা চলছে। যে বিষয়গুলো বা দাবিগুলো এসেছে, আমরা অবশ্যই আপনাদের এই বার্তাটি সরকারকে জানাব।’
উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণ সরকারের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে আসবেন বা কে থাকবেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। এটি এখানে আমাদের সিদ্ধান্ত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেগুলো আমাদের পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, সেগুলো আমরা আমলে নিলাম। আর যেগুলো সরকারের সিদ্ধান্ত, সেগুলো সরকার ব্যবস্থা নেবে।’
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, সেই বিবেচনায় অসুস্থ উপাচার্যসহ অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। উপাচার্যকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনার পর তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী ছিলেন। শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি বুঝেছে, তারা পরিণত। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে উপাচার্যের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ জন্যই আমি ও জেলা প্রশাসক মহোদয় আজ এসেছিলাম। শিক্ষার্থীরাও আলোচনার পর পরিস্থিতি বুঝেছে। কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই আমরা তাঁকে নিয়ে গেলাম। আগে চিকিৎসা দিই, তিনি সুস্থ হোন। পরের বিষয়গুলো পরে সরকারকে জানাব।’
আলোচনার সময় শিক্ষার্থীরা চুয়েটের একটি বাসে হামলার অভিযোগও তোলেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ তদন্ত করে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার সকালে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে অবরুদ্ধ করেন। ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে।
দীর্ঘসময় অবরুদ্ধ থাকার পর উপাচার্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। মঙ্গলবার তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. টিপলু কান্তি দে। এ সময় উপাচার্যের রক্তচাপ ১৫০/১০০ পাওয়া যায়। তিনি বুকে ও শরীরের বাঁ পাশে তীব্র ব্যথার কথাও জানান। চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।


