একসময় নিজের ট্রলার ও মাছ ধরার জাল ছিল সোহাগ বয়াতির। সাগরে মাছ ধরে ভালোই চলত সংসার। কিন্তু দিনের পর দিন মাছ কম ধরা পড়ায় লোকসানের মুখে পড়েন তিনি। ঋণের বোঝা সামলাতে শেষ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিতে হয় ট্রলার ও জাল। এখন অন্যের ট্রলারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তিনি। তবু ঋণ শোধ হয়নি। এখনো বাকি পাঁচ লাখ টাকা।
একই পরিণতি হয়েছে সোহরাব তালুকদারের। একসময় তার ট্রলারে কাজ করতেন আট থেকে ১০ জন জেলে। কিন্তু টানা লোকসানে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ঋণ জমে যায়। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দেন ট্রলার ও জাল। এখন নিজেই অন্যের ট্রলারে শ্রমিকের কাজ করেন। এরপরও তার ঋণ রয়েছে সাত লাখ টাকা।
মাছ ব্যবসায়ী আমিনুর হাওলাদার ঋণ শোধ করতে বিক্রি করে দিয়েছেন পরিবারের বসতভিটা। ৪০ লাখ টাকায় বাড়ি বিক্রি করেও সব দেনা মেটাতে পারেননি। একপর্যায়ে পাওনাদারদের চাপ সহ্য করতে না পেরে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।
সোহাগ, সোহরাব কিংবা আমিনুরের এই দুর্দশা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাগেরহাটের শরণখোলা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকার হাজারো জেলে, ট্রলারমালিক ও মাছ ব্যবসায়ী এখন একই সংকটে পড়েছেন। কারও জীবিকার শেষ সম্বলটুকু বিক্রি হয়ে গেছে, কেউ ঋণের চাপে ছেড়েছেন বসতভিটা। যারা কোনোমতে টিকে আছেন, ঋণ শোধের আশা তো দূরের কথা, দুবেলা খাবার জোগাড় করতেই তাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
সাগরে মাছ কম ধরা পড়ছে, অথচ ট্রলার চালানোর খরচ বাড়ছে। একের পর এক লোকসান সামলাতে ঋণ নিতে হচ্ছে। সেই ঋণ শোধ করতে আবারও সাগরে যেতে হচ্ছে। কিন্তু মাছ না পেলে বাড়ছে দেনার বোঝা। এভাবেই ঋণের চক্রে আটকে পড়ছেন উপকূলের জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
শরণখোলার চালরায়েন্দা গ্রামের জেলে শাহীন তালুকদার প্রায় ১৫ বছর ধরে অন্যের ট্রলারে ভাগের ভিত্তিতে মাছ ধরছেন। এ মৌসুমে চার মাস সাগরে মাছ ধরে তার আয় হয়েছে মাত্র ৩২ হাজার টাকা। পাঁচ সদস্যের পরিবারের সারা বছরের খরচ চালাতে এই টাকা যথেষ্ট নয়।
শাহীন বলেন, ‘ট্রলারমালিকের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং স্থানীয় সুদে টাকা ধার দেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে আরও এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। মাছ কম পাওয়ায় কোনো ঋণই শোধ করতে পারছি না।’
বাগেরহাট জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় জেলের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৬২৭। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ জন নিবন্ধিত সমুদ্রগামী জেলে। মৎস্য উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের বিভিন্ন মেয়াদে খাদ্যসহায়তা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়।
তবে উপকূলের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের পর বছর মাছ ধরেও অনেকের ঋণ কমছে না। সংসারের খরচ চালাতে এবং নতুন করে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে তাদের আবারও ধারদেনা করতে হচ্ছে। শরণখোলা ও আশপাশের এলাকায় অনেক জেলের ঋণ এক থেকে দুই লাখ টাকা। কারও ঋণ সাত থেকে আট লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। কোনো কোনো ট্রলারমালিকের দেনা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
রাজেশ্বর গ্রামের জামাল তালুকদার ও তাফালবাড়ির ওমর ফারুকের প্রত্যেকের ঋণ এক লাখ টাকা। তাতালির রফিকুল খানের ঋণ দুই লাখ টাকা। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের খাউলিয়া গ্রামের সাজিব হাওলাদার ও পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার তুষখালী গ্রামের আলামিন শিকদারও একই সংকটে রয়েছেন। মাছ ধরার আয় কমে যাওয়ায় তাদের ঋণ জমেছে যথাক্রমে এক লাখ ও দেড় লাখ টাকা।
নিষেধাজ্ঞায় আয় বন্ধ, বাড়ে ঋণের চাপ
মাছ কম পাওয়ার সংকটের মধ্যে জেলেদের জন্য নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে এসেছে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নদী ও সাগরে ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এ নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ সময়ে হাজারো জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েন। যেসব পরিবার মাছ ধরার আয় দিয়ে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করে, তাদের জন্য টানা ২২ দিন আয় বন্ধ থাকা বড় সংকট। অথচ সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে কেউ ট্রলারের জাল মেরামতের কাজ করছেন, কেউ দিনমজুরির সন্ধানে ঘুরছেন। আবার অনেকে খাবার ও সংসারের খরচ চালাতে নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন। যাদের আগে থেকেই দেনা রয়েছে, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
লোকসানের চাপ শুধু জেলেদের নয়, ট্রলারমালিক ও মাছ ব্যবসায়ীদেরও। সাগরে ট্রলার পাঠাতে জ্বালানি, খাবার, বরফসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত মাছ না পেলে সেই খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
শরণখোলার মাছ ব্যবসায়ী ও ট্রলারমালিক হালিম বয়াতি বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে তার শেষ ট্রলারযাত্রায় খরচ হয়েছিল তিন লাখ টাকা। মাছ বিক্রি করে আয় হয়েছিল সাড়ে চার লাখ টাকা। ট্রলারে থাকা ১৮ জন জেলের প্রত্যেকে পেয়েছেন তিন হাজার ২০০ টাকা করে। সব খরচ ও পাওনা মেটানোর পর তার কোনো লাভ হয়নি।
আরেক ট্রলারমালিক বেলায়েত খান জানান, শেষবার সাগরে মাছ ধরতে তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় পুরো টাকাই লোকসান হয়েছে। শহিদুল ইসলাম মৌসুমজুড়ে আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও লাভের মুখ দেখেননি। অন্যদিকে ট্রলারমালিক রফিকুল হাওলাদারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ টাকা।
ট্রলারমালিকদের ভাষ্য, একটি ট্রলার একবার সাগরে পাঠাতে সাধারণত তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়। পর্যাপ্ত মাছ না পেলে মূলধনও উঠে আসে না। একের পর এক লোকসান সামলাতে মাছের আড়তদার ও বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিতে হয়। পরের যাত্রায়ও মাছ কম ধরা পড়লে ঋণের বোঝা আরও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ট্রলার, জাল কিংবা বসতভিটা বিক্রি করা ছাড়া অনেকের সামনে আর কোনো পথ থাকে না।
নিষিদ্ধ ট্রলিংয়ে কমছে মাছ, বিপাকে প্রথাগত জেলেরা
জেলেদের অভিযোগ, অবৈধ ট্রলিং ও ছোট ফাঁসের চিংড়ি জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে শুধু মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
তাদের দাবি, এসব জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছের পোনা, ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। পানির উপরিভাগ থেকে তলদেশ পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের মাছ ও জলজ প্রাণী জালে আটকা পড়ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামুদ্রিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে।
এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে মাছ ধরা জেলেরাও। তাদের অভিযোগ, ট্রলিং করা নৌযানগুলো মাছ ধরার এলাকায় অন্য জেলেদের পেতে রাখা জালের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যায়। এতে লাখ লাখ টাকার জাল নষ্ট হয়। জাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেক জেলে সাগরে জাল ফেলতেও ভয় পান। ফলে মাছ ধরার সুযোগ ও আয়—দুটিই কমে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাগর ও বনের জলদস্যুদের ভয় এবং মৌসুমে বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে নিরাপদে সাগরে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত মাছ পাওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকূলের জেলেদের কাছে।
সহজ শর্তে ঋণ ও বিকল্প কাজের দাবি
দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে থাকা জেলে ও ট্রলারমালিকরা বলছেন, তাদের সংকট কাটাতে শুধু খাদ্যসহায়তা যথেষ্ট নয়। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত সহায়তার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে সাগরে জলদস্যুদের হাত থেকে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ করা এবং অবৈধ ছোট ফাঁসের জালের উৎপাদন ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা ও প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়ানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে জেলেদের আয়ও বাড়তে পারে।
শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে চাল খাদ্যসহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে।
তবে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি।


