দুই দশকের অর্জনে উল্টো হাওয়া, চার বছরে নতুন দরিদ্র ৮০ লাখ

দুই দশকের অর্জনে উল্টো হাওয়া, চার বছরে নতুন দরিদ্র ৮০ লাখ
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

টানা দুই দশক ধরে দারিদ্র্য কমিয়ে উন্নয়নের বৈশ্বিক উদাহরণ হয়ে ওঠা বাংলাদেশে আবার উদ্বেগজনক হারে দারিদ্র্য বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাবে গত চার বছরে দেশে নতুন করে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। এর মধ্যে শুধু গত অর্থবছরেই দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ।

এর পাশাপাশি দেশের আরও প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে বাস করছেন, যারা ছোটখাটো অর্থনৈতিক ধাক্কায় যেকোনো সময় চরম দারিদ্র্যের মুখাপেক্ষী হতে পারেন।

মাসের ১০ তারিখেই বেতনের টাকা শেষ, ২০ তারিখে বাজারের বাজেট উধাও, ২৫ তারিখে ধার পাওয়ার আকুল চেষ্টা, আর মাস শেষে সেই দেনা শোধের সামর্থ্য নিয়ে তীব্র দুশ্চিন্তা—আজকাল এটিই দেশের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তব চিত্র। চাকরি নেই, আবার চাকরি থাকলেও বেতন কম; আর যেটুকুই বাড়ুক না কেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের দাপটে তা নিমিষেই ফিকে হয়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় অসুস্থতার চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ কেনার অতিরিক্ত খরচ। রাতে ঘুমাতে গেলেও মাথায় ঘোরে নিত্যপণ্যের বাজারদর, ঘরভাড়ার তাগাদা আর সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তা।

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হাফিজুল ইসলামের কণ্ঠেও এই মানসিক চাপের প্রতিধ্বনি। ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আর কুলাতে পারছি না, ভাই। নিত্যদিনের সরঞ্জামাদি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, ঘরভাড়া সবকিছু যেভাবে বাড়ছে, তাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

একই চিত্র ফুটে উঠেছে রাজধানীর ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকার বাসিন্দা সঞ্জয় কুমারের জীবনেও। আয় সামান্য বাড়লেও জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধির ফলে সংসার চালাতে এখন তাকে নিয়মিত সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।

সঞ্জয় কুমার বলেন, ‘সবকিছুর খরচ এত বেড়েছে যে, বেতনের টাকা দিয়ে মাস পার হচ্ছে না। আগের কিছু সঞ্চয় ছিল, সেটাও এখন প্রায় শেষের দিকে। এভাবে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার কীভাবে চালাব, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে দেব, সেটাই ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না।’

বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, গত চার বছরের এই টানা অবনতি বাংলাদেশকে এক বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলেছে। অথচ একসময় বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বমডেল হিসেবে গণ্য করা হতো।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০০১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পরের দুই দশকে কৃষি, শিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের ওপর ভর করে দারিদ্রের হার নেমে আসে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে চিত্রটি পুরো উল্টে যায়।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নতুন করে দরিদ্র হন প্রায় ৮ লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়ে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭ লাখে। ২০২৫ সালে এ হার ২১ শতাংশ অতিক্রম করে আরও ১৪ লাখ মানুষকে দরিদ্র বানায়। আর গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে নতুন করে আরও ২১ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের কাতারে ঠেলে দেয়।

আরও পড়ুন

বাড়ছে ব্যয়, কমছে আয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গেটে চায়ের দোকান চালান সোহেল মিয়া। কিছুদিন আগেই অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে না পেরে মাকে হারিয়েছেন তিনি। সেই আক্ষেপ ও অপরাধবোধ সোহেলকে তাড়া করে ফেরে প্রতিদিন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো গরিব মানুষ, সারাদিন দোকানদারি করে যে আয় হয়, তাতে দিন আনি দিন খাই। আম্মা মারা গেলেন, হাসপাতালে তো নিয়েছিলাম। ঠিকমতো ওষুধপত্র, সেবা দিতে পারিনি।’

সোহেলের এই ব্যক্তিগত কষ্ট দেশের বর্তমান দারিদ্র্যের সার্বিক পরিস্থিতির এক নগ্ন সত্য প্রকাশ করে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দারিদ্র্য বাড়ার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হলো দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায়। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে টাকার অবমূল্যায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির দরুন তা পৌঁছায়নি। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা উৎপাদন ও পরিবহন খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিপরীতে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির বদলে কমে তা ঋণাত্মক ধারায় ধাবিত হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন টাইমস’কে জানান, মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পেলেও সাধারণ মানুষের সহনশীল পর্যায়ে আসেনি। টিকে থাকার জন্য মানুষ জমা সঞ্চয় শেষ করছে, ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি গৃহপালিত পশু ও জায়গাজমির মতো সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন সিদ্দিকী বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘চাকরি হারানো, গুরুতর অসুস্থতা, ব্যবসায় লোকসান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মতো একটি ধাক্কাই দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।’

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে চরম মন্দা

দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেখানে আগে প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশে ছিল, তা নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। পাশাপাশি একই অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক সাত শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানিও কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যবসায়ের আস্থা সংকট, ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগকে স্থবির করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, শিল্প খাত ও তৈরি পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে ধস নেমেছে। নারী কর্মসংস্থান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৩০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, যা কর্মক্ষম মানুষের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

দরিদ্রের বরাদ্দে সচ্ছলদের ভাগ

সামাজিক সুরক্ষা ও জ্বালানি-সার ভর্তুকিতে সরকার জাতীয় জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করলেও তার সিংহভাগই প্রকৃত দুস্থ মানুষের নাগালে পৌঁছায় না। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৬২ শতাংশই কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল পান না। উপরন্তু, বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সুবিধাই ভোগ করছে দেশের সবচেয়ে ধনবান ২০ শতাংশ পরিবার।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, উচ্চ খাদ্যমূল্য, মজুরির ক্ষয় এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ভঙ্গুর চাকরির ধরন নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল মানুষ দরিদ্র হওয়ার পর সাময়িক ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকে, যা প্রতিরোধমূলক সুরক্ষা গড়ে তুলতে ব্যর্থ। এ থেকে উত্তরণে শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা না বাড়িয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রকৃত আয় বাড়ানো জরুরি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad