নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবারও দুই রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগ উঠেছে। তাদের একজনের এনআইডি ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যজনের এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে তথ্য আপলোড করা হলেও বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় তা হস্তান্তর করা হয়নি।
এর আগে একই নির্বাচন অফিসে রোহিঙ্গা নাগরিককে এনআইডি করে দেওয়ার অভিযোগে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত তিনজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। একই ঘটনায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের বাসিন্দা দেখিয়ে নূর হালিমা (২৫) ও মুজিবুর রহমান নামে দুজনের এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। নূর হালিমার এনআইডি গত ১১ আগস্ট হস্তান্তর করা হয়। মুজিবুর রহমানের ফাইল নম্বর ১২১১৫০৭৯১। তার ঠিকানাও শান্তিনগর গ্রাম দেখানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের আইডি ব্যবহার করে নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এনআইডি তৈরির কাগজপত্র নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আপলোড করা হয়। ওই রাতে শুধু এই দুজনের তথ্যই আপলোড করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
নূর হালিমার এনআইডিতে বাবার নাম দেওয়া হয়েছে শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলী এবং মায়ের নাম শরীফা খাতুন। তবে সরেজমিনে ওই গ্রামে গিয়ে ওমর আলীর সঙ্গে কথা বলে নূর হালিমা নামে কোনো সন্তান থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওমর আলী বলেন, তার চার সন্তান, দুই ছেলে কাওছার মিয়া ও শামীম মিয়া এবং দুই মেয়ে আসমা আক্তার ও মাইমুনা আক্তার। নূর হালিমা নামে তার কোনো মেয়ে নেই।
তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে নির্বাচন অফিসের কয়েকজন লোক তার বাড়িতে গিয়ে নূর হালিমা নামে কোনো মেয়ে নেই, এ বিষয়ে বিভিন্ন ফরমে তার স্বাক্ষর নেন। একই সঙ্গে এলাকার কয়েকজনের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়।
ওমর আলীর ছেলে শামীম মিয়া বলেন, ‘নূর হালিমা নামে আমাদের কোনো বোন নেই। আমার মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অন্য একজনকে তাদের সন্তান দেখিয়ে কীভাবে এনআইডি তৈরি করা হলো, বুঝতে পারছি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা জাবেদ মিয়া বলেন, নতুন ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাইও করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অজান্তে এ ধরনের এনআইডি তৈরি সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তিনি।
মুজিবুর রহমানের এনআইডির কপি পাওয়া না যাওয়ায় তার বাবা-মায়ের নাম বা পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, নতুন ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন, বাবা-মায়ের এনআইডি, নাগরিক সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাই ও স্ক্যান করার পর সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার অপারেটর নিজস্ব আইডি ব্যবহার করে তথ্য সার্ভারে প্রাথমিকভাবে সংরক্ষণ করেন। এরপর নির্বাচন কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি দাবি করেন, নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমান দুজনই রোহিঙ্গা নাগরিক। স্থানীয় দালালের মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের এনআইডি তৈরির চুক্তি হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ওই ব্যক্তির দাবি, রাতে এনআইডির তথ্য আপলোডের নিয়ম না থাকলেও ১১ আগস্ট রাতে শুধু ওই দুজনের তথ্য নির্বাচন অফিসের আইডি থেকে সার্ভারে আপলোড করা হয়। তবে তার এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ওই দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র কীভাবে হয়েছে, তা আমি জানি না। এত মানুষ ভোটার হতে আসে, সবার বিষয় যাচাই করা কঠিন। নূর হালিমার এনআইডি হস্তান্তর করা হয়েছে। মুজিবুর রহমানেরটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।’
তিনি জানান, ওই দুই ব্যক্তির বিষয়ে এলাকায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে। এনআইডিতে দেওয়া পরিচয়ের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য, ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ওই দুই ব্যক্তির এনআইডি তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন বলেন, ‘এর আগেও কলমাকান্দা নির্বাচন অফিসে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এখন আবার এমন ঘটনা ঘটেছে। বারবার কেন এমন হচ্ছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পুরো অফিস ক্লিন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
এর আগে গত ২০ জুলাই কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত তিনজনকে রোহিঙ্গা নাগরিককে বাংলাদেশি এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছিল।


