তেজগাঁও ফের ট্রাকের দখলে

তেজগাঁও ফের ট্রাকের দখলে
ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান/টাইমস
Advertisement
Advertisement

প্রায় এক যুগ আগে ছোটখাট লড়াই করে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়ক থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা হলেও সেই রাস্তা এখন আবার পুরনো চেহারায় ফিরে গেছে। সড়কের একটি বড় অংশই ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের দখলে চলে গেছে। পাশের ফুটপাত ও সংযোগ সড়কগুলোতেও সারি করে রাখা হচ্ছে পণ্যবাহী যান। এতে যান চলাচলের জায়গা একদিকে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০০ ফুট প্রশস্ত সড়কের একাধিক লেনজুড়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান থামিয়ে রাখা থাকে। কোথাও দুই-তিন সারি করে গাড়ি রাখায় একসঙ্গে দুইটি যান চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। রিকশার জন্য আলাদা করে দেওয়া লোহার বেড়ার অধিকাংশও এখন নেই।

ফুটপাত ঘেঁষে আড়াআড়িভাবে ট্রাক রাখায় অনেক জায়গায় গাড়ির পেছনের অংশ ফুটপাত পর্যন্ত চলে গেছে। ফলে পথচারীদের হাঁটার সুযোগও থাকে না। বাধ্য হয়ে তাদের মূল সড়কে নামতে হচ্ছে।

শিল্পাঞ্চল ও কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি হওয়ায় কয়েক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাভার্ড ভ্যান, কার্গো ট্রাক ও পিকআপ এ এলাকায় আসছে। এসব যান রাখার জন্য নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত টার্মিনাল না থাকায় কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে সাতরাস্তা, বেগুনবাড়ী ও আশপাশের সড়কে পার্কিং শুরু হয়।

কোথাও কোথাও এসব গাড়ি সড়কে রেখেই চলে ইঞ্জিন মেরামত, বডি ঝালাই, ডেন্টিং-পেইন্টিং ও চাকা খোলার কাজ। রাস্তার ওপর ছড়িয়ে রাখা হয়েছে গাড়ির যন্ত্রাংশ ও মেরামতের সরঞ্জাম।

তেজগাঁও শিল্প এলাকার এ অংশে রয়েছে বিআরটিসি তেজগাঁও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), কেপিআইভুক্ত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার (সিএসডি)। আছে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট, সংবাদপত্র ভবন, ছাপাখানা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চলাচল করে।

সরকারি ও কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ ঘেঁষে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও মেরামত কার্যক্রম কেবল যান চলাচলকে ধীর করে দিচ্ছে না, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা সংকটও তৈরি করছে।

বেগুনবাড়ীর মুদি দোকানি মুরাদ সরকার টাইমসকে বলেন, ‘ট্রাকের পেছনে ফুটপাতেও অনেকে বসে নেশা করে। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটি। দিনের বেলায় চলাচল করা গেলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।’

বিসিকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাকগুলো এমনভাবে রাখা হয় যে অফিসের গাড়ি ঢোকানো বা বের করা কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় এক লেন দিয়ে গাড়ি চলাচল করে। গাড়ি ঘোরানোও কঠিন হয়ে পড়ে।’

আরও পড়ুন

সরকারি ওষুধ কোম্পানি এসেনশিয়াল ড্রাগসের কর্মকর্তা মাসুম হোসেন বলেন, ‘শ্রমিকরা ট্রাক রেখে যায়, সরাতে বললেও শোনেন না। বেশি কিছু বলাও যায় না। অনেক সময় বাজে ব্যবহার করে।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ, ট্রাকের আড়ালে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা থাকে।

এ পথে নিয়মিত যাত্রী শিক্ষার্থী ফাহিম হাসান বলেন, ‘সবসময়ই ভয়ে থাকতে হয় কখন কোন বিপদে পড়ি।’

কফিল উদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘দেশ যেমন চলছে আরকি। ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বলা মুশকিল।’

ট্রাক মালিক-শ্রমিকদের দাবি, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়ে সড়কে গাড়ি রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির অফিস সেক্রেটারি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ দাবি করেন, আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র থাকাকালে এই জায়গা তাদের সংগঠনকে দেওয়া হয়েছিল। ফলে একে অবৈধ দখল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আবদুল্লার ধারণা, স্ট্যান্ডটিতে ৪০০ থেকে ৫০০টি ট্রাক রাখা সম্ভব। তবে জায়গাটি সম্পূর্ণ ভর্তি হওয়ার পরও অতিরিক্ত অনেক ট্রাক থেকে যায়। তখন কিছু গাড়ি সড়কে রাখতে হয়। পুলিশ সাধারণত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘ট্রাক রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা আমাদের নেই। টার্মিনাল থাকা এবং সেখানে ট্রাক রাখার ব্যবস্থা থাকা আমাদের মৌলিক প্রয়োজন। স্থায়ী ও পরিকল্পিত ট্রাক টার্মিনাল তৈরি হলে সড়কে গাড়ি রাখার প্রয়োজন হবে না।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ট্রাফিক-তেজগাঁও বিভাগ) উপ-কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘ট্রাক পার্ক করে রাখার কারণে যানজট ও ভোগান্তি হচ্ছে। এ বিষয়ে ট্রাক মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের আলোচনা হয়েছে।’

ওই এলাকায় আড়াই থেকে তিন হাজার ট্রাক অবস্থান করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক গাড়ির বিরুদ্ধে শুধু মামলা বা আটক করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য বিকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন।’

তিনি পণ্যবাহী যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট টার্মিনাল এবং শহরের বাইরে বা বাইপাসমুখী নির্ধারিত রুটের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে সড়ক দখল আর উচ্ছেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সবচেয়ে আলোচিত উচ্ছেদটি করা হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সে সময়ের মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে তেজগাঁওয়ের সড়ক থেকে সব ট্রাক সরিয়ে দেয়া হয়। এ নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে পুলিশ-শ্রমিকের লড়াই বহু বছর আলোচনার খোড়াক জুড়িয়েছিল।

২০১৭ সালে আনিসুলের মৃত্যুর পরের বছরের জুনে সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত সড়কটির নাম দেওয়া হয় ‘মেয়র আনিসুল হক সড়ক’। আশপাশের সংযোগ সড়কও দখলমুক্ত করা হয় সে সময়। সাতরাস্তা থেকে তেজগাঁও লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত করার উদ্যোগও তখন নেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালেও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগ অভিযান চালিয়ে সাতরাস্তা-রেলগেট সড়ক থেকে ট্রাক-ভ্যানের অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ করে। পরে কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হলেও আবার সড়ক ও আশপাশের জায়গায় ট্রাক পার্কিং শুরু হয়।

তেজগাঁওয়ে বহুতল ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টার্মিনালের জন্য বরাদ্দ করা জমির অনুমোদন বাতিল হওয়ায় সেই উদ্যোগও অনিশ্চয়তায় পড়ে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad