প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর/ ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাইবে ঢাকা

২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাইবে ঢাকা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর টোকিও সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে প্রধান প্রধান অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের খরচ কমানো এবং জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে ২০০ কোটি ডলার সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ।

জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী এবং স্বাধীনতার পর থেকে প্রধান অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে। সে কারণে এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেপররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়েঅনুষ্ঠিত হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক। এতে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে তুলে ধরার মতো বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বিষয় ও অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগসহ বেশ কিছু মেগা প্রকল্প জাপানি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট)-সহ কয়েকটি প্রকল্পের আলোচনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সফরকালে আলোচনার মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। জাপানি ঋণের সুদের হার একটি অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। আমাদের এই বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।’

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একটি জাপানি কনসোর্টিয়াম এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মধ্যেও একটি অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। খবর অনুযায়ী, রাজস্ব ভাগাভাগি ও আর্থিক মডেল নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।

জাপানি ঋণের ক্রমবর্ধমান খরচ

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে জাপানের উন্নয়ন সহায়তার অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিক ছিল ঋণের নমনীয় সুদ হার, যা ছিল ১ শতাংশের নিচে।

তবে, জাপানি ঋণের সুদের হার বাড়তে থাকায় বড় বড় প্রকল্পের নতুন কিছু অংশের জন্য অর্থায়নের শর্তাদি আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ এমআরটি প্রকল্পের জন্য ১৩ হাজার ৬২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার একটি প্রাথমিক জাপানি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এর সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। তবে, সেই সময়ে প্রকল্পের অবশিষ্ট অংশের জন্য অর্থায়নের শর্ত নির্ধারণ হয়নি।

আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে কমলাপুরকে যুক্তকারী এমআরটি লাইন-১-এর জন্য জাপানি অর্থায়ন এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়।

তবে এই অতিরিক্ত অর্থায়ন বর্তমান ঋণের শর্তাধীনে গ্রহণ করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ঋণের হার সম্প্রতি ৩ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশে পৌঁছেছে। অক্টোবরে তা ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

যেহেতু জাপান বছরে দুবার তাদের ঋণের সুদের হার পর্যালোচনা করে, তাই আগামী এপ্রিলে হারগুলো পুনরায় নির্ধারণের সময় আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়ে গেছে।

সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককালে বাংলাদেশ এই ক্রমবর্ধমান অর্থায়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সুদের হার কমানো হবে সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। কারণ উচ্চ সুদের হার প্রকল্পের ব্যয়কে অত্যধিক মাত্রায় বাড়িয়ে দেবে।’

ঋণের সুদ হারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের বৃহত্তম কিছু অবকাঠামোগত প্রকল্প, যেমন—মেট্রোরেল উন্নয়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী উন্নয়ন উদ্যোগের সঙ্গে জাপান যুক্ত রয়েছে।

২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি সহায়তা চায় ঢাকা

ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানি খরচ মেটাতে এবং দেশের লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ কমাতে জাপানের কাছে ২০০ কোটি ডলারের সহায়তা চাইছে বাংলাদেশ।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পটভূমিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় সমস্যায় পড়া এশীয় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকে সহায়তা করতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১০ বিলিয়ন ডলারের ‘পাওয়ার এশিয়া ইনিশিয়েটিভ’ চালু করে জাপান। আসিয়ান অর্থনীতি ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হিসেবে যেসব দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

অন্য এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘জ্বালানি আমদানির খরচ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং তা লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ঢাকা এই চাপ কমাতে চায়। অতিরিক্ত খরচ মেটাতে ২০০ কোটি ডলারের একটি তহবিল সরবরাহের জন্য টোকিওকে অনুরোধ করেছে।’

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই প্রস্তাবের বিষয়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীন ও জাপানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা

উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাইরেও এই টোকিও সফরের একটি বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে চীন, জাপান এবং অন্যান্য প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।

একটি সম্ভাব্য সংবেদনশীল বিষয় হলো সফরের পর প্রকাশযোগ্য যৌথ বিবৃতিতে ব্যবহার করা ভাষা।

জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে উভয় পক্ষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল ধরে রাখতে একমত হয়। এ ছাড়া কায়রো ঘোষণা, পটসডাম ঘোষণা ও জাতিসংঘ সনদসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইনি দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমর্থনের বিষয়ে সম্মত হয়।

কায়রো ঘোষণা এবং পটসডাম ঘোষণার উল্লেখ জাপানের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, এই দলিলগুলো পূর্ব এশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মীমাংসার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad