বাগেরহাটের রামপালে দেশের বৃহত্তম ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ৬৮৫ একর জমি কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেকের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি ছাড়াও আরও ১১টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রামপালের প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। বাকি অর্থ বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১২ সালে বাগেরহাটের রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বিপিডিবি। জমিটি দুটি ব্লকে ভাগ করা হয়—ব্লক-এ ও ব্লক-বি। এর মধ্যে ব্লক-এ অংশে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। আর ব্লক-বি অংশটি বর্তমানে বিপিডিবির অধীনে রয়েছে। সেখানে ভূমি উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিপিডিবির প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এ জ্বালানি ব্যয়বহুল এবং বহির্বিশ্বের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, কপ-২৬-এর সিদ্ধান্ত, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান (আইইপিএমপি)-২০২৩ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবর্তে রামপালে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিপিডি জানিয়েছে, ব্লক-বির মোট ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমির মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬৩ একর গ্রিন বেল্ট উন্নয়নের জন্য, ৩২ দশমিক ৮৭ একর বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণের জন্য এবং ৯৪ একর নিচু জমি রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম পাশে প্রায় ৩০ একর জমি লেক হিসেবে রয়েছে। এসব জমি বাদ দেওয়ার পর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৬৮৫ একর নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী ডিজিটাল শিল্পের বিকাশ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান ২০২৩-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াবে যথাক্রমে ২৯ হাজার ২৫৭, ৫৮ হাজার ৫৯৭ ও ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট (২০২৫ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত)। দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
এ অবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ প্রণয়ন করেছে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ মোট উৎপাদনের তুলনায় সীমিত। ফলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
একনেকে উঠছে আরও ১১ প্রকল্প
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি বুধবারের একনেক সভায় আরও ১১টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প। রংপুর সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ প্রকল্পও রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) জন্য চারটি বাণিজ্যিক ও চারটি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণের প্রকল্প একনেকে উঠছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয় করা চ্যান্সারি ভবন সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পও অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে।
অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে পঞ্চগড়ের জেড-৫০৫০ সড়কের ১৬তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ, খানটি-রিসামাকরি-মাদন-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।


