২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে বিচারিক আদালত অপর্যাপ্ত ও লঘু শাস্তি দিয়েছে বলে মনে করছে প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় মনে করে, অপরাধের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বিবেচনায় আসামির মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য, এটিই যথাযথ এবং ন্যায়বিচার।
এমন দাবি ও যুক্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সোমবার আপিল করেছে প্রসিকিউশন। আপিলে কারাবন্দী ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১১টি গ্রাউন্ড বা যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, এই আদালতের প্রতিষ্ঠিত আইনগত নীতি হলো, ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করলে মৃত্যুদণ্ডই হলো সাধারণ বিধান। অপরাধের গুরুত্ব ও ভয়াবহতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড হলো ব্যতিক্রম। উপযুক্ত সাজা দেওয়ার সময় ট্রাইব্যুনালকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অপরাধীদের বিচারের দাবিতে সমাজের যে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ কারণে, তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের যে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা আইনসম্মত নয়। তিন অভিযোগে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড হলেও সাজাগুলো একসঙ্গে চলবে বলে কার্যত তাকে ১০ বছরই কারাভোগ করতে হবে।
ওই সাজা বাড়িয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে তার মালিকানাধীন সম্পত্তির মোট মূল্যের সমপরিমাণ করার দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে ওই অভিযোগগুলোতেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভুক্তভোগীদের জন্য ইনুর সম্পত্তির মোট মূল্যের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক বিচারব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, যারা নেতৃত্ব দেন তাদের অপরাধগত দায় সাধারণত অনুসারীদের চেয়ে বেশি। বেসামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন দায়ের কারণে সামরিক নেতার তুলনায় তুলনামূলকভাবে কঠোর সাজা দেওয়া হয়। কারণ কোনো বেসামরিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতার দেওয়া আদেশ বা নির্দেশ সাধারণত একজন সেনা জেনারেলের আদেশের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক বিচারব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, বেসামরিক বা রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত সরাসরি সক্রিয়ভাবে অপরাধ সংঘটন না করলেও তাদের অধীনস্থদের ওপর থাকা ঊর্ধ্বতন দায় অপরাধ সংঘটনের পরিবেশ তৈরি ও তা প্রভাবিত করতে সরাসরি ভূমিকা রাখে এবং দায়মুক্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া, ঊর্ধ্বতন দায়ের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত বেসামরিক বা রাজনৈতিক নেতাদের তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সাজা দেওয়া হয়। কারণ তাদের অনুসারীদের কাছে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসারীরা তাদের নেতাদের আদর্শ হিসেবে দেখে এবং তাদের বিশেষ প্রভাবের অধীন থাকে।
চতুর্থত, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২০(২) ধারার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যথাযথভাবে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হলে ট্রাইব্যুনালের প্রধান বা প্রাথমিক সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা। এর চেয়ে কম সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই শক্তিশালী ও বাধ্যতামূলক কোনো বিশেষ কারণ থাকতে হবে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এমন কোনো বিশেষ কারণ শনাক্ত বা ব্যাখ্যা করেনি।
পঞ্চমত, তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগে যে অপরাধগুলোর জন্য আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম অভিযোগে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল; সেগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এসব অপরাধের সঙ্গে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক বা পরিকল্পিত হামলা জড়িত। ১৯৭৩ সালের আইনের ২০ ধারার অধীনে এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত ছিল। আদালত বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।
ষষ্ঠত, নথিতে থাকা সাক্ষ্যপ্রমাণ, যার মধ্যে লিখিত ও ডিজিটাল প্রমাণ এবং প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের জবানবন্দি রয়েছে, তা প্রথম থেকে অষ্টম অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আসামির অপরাধ স্পষ্ট ও চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে। ফলে অপরাধের জঘন্য প্রকৃতি, বেসামরিক জনগণের ওপর হামলার ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা বিবেচনায় তার মৃত্যুদণ্ড হওয়াই উপযুক্ত ও ন্যায়সংগত ছিল।
সপ্তমত, প্রথম থেকে অষ্টম অভিযোগে আসামির সংঘটিত অপরাধের ভয়াবহতা তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। কিন্তু এ বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করে আদালত আইনের ভুল প্রয়োগ করেছে।
অষ্টমত, কোনো আসামিকে সাজা দেওয়ার সময় আদালতকে শুধু অপরাধীর ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ সাজা পাওয়ার অধিকার এবং তার প্রাপ্য ক্ষেত্রে দয়ার বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। অপরাধের শিকার ব্যক্তিদেরও অধিকার রয়েছে যে, অপরাধীকে যথাযথ শাস্তি দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে আদালতকে সমাজের যৌক্তিক প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হবে। অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর এমন সাজা দেওয়াই সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আসামি যে জঘন্য অপরাধ করেছেন, তার প্রতি সমাজের যে তীব্র ঘৃণা বা নিন্দা রয়েছে; সাজা নির্ধারণের সময় সেটিও আদালতের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
নবমত, ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার সময় ট্রাইব্যুনাল অপরাধের ভয়াবহতা এবং অপরাধীর দায়ের মাত্রার মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রধান নীতিটি বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
অপরাধের ভয়াবহতাকে সাজা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করলে তৃতীয়, ষষ্ঠ এবং মূল নথিতে উল্লিখিত অষ্টম অভিযোগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার জন্য এটি উপযুক্ত মামলা। এসব অভিযোগে আসামির কর্মকাণ্ড ছিল নির্মম, ঠান্ডা মাথায় সংঘটিত, নৃশংস ও বর্বর।
এ ছাড়া, প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ পঞ্চম ও অষ্টম অভিযোগে দেওয়া খালাসের সিদ্ধান্তও বাতিলযোগ্য। কারণ ওই অভিযোগগুলোতে আসামির অপরাধ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। রায়ের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণেও বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে বলে প্রসিকিউশন মনে করে।
দশমত, অপরাধ সংঘটনে উসকানি এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে আসামি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে পৈশাচিকভাবে বহু মূল্যবান প্রাণের নির্বিচার ধ্বংস ঘটিয়েছেন এবং এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন। এতে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগীরা ছিলেন অসহায়। তাদের টার্গেট বানিয়ে গভীরভাবে নিন্দনীয়, নৃশংস ও ঘৃণ্য পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়েছে, যা যে কোনো বিবেকবান মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।
একাদশত, প্রথম থেকে অষ্টম অভিযোগের ক্ষেত্রে আদালত যে সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করেছে, যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে এবং যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে; তার সঙ্গে আসামির জন্য নির্ধারিত সাজায় স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।
অর্থাৎ, ট্রাইব্যুনাল অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নিজস্ব অনুসন্ধানকে চূড়ান্ত বা নিশ্চিত বলে গ্রহণ করেছে; সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়নি।
প্রসিকিউশন মনে করে, আদালত যে অপরাধগুলো প্রমাণিত বলে গ্রহণ করেছে, সেগুলোর ভয়াবহতা, আসামির নেতৃত্ব ও ঊর্ধ্বতন দায় এবং অপরাধের ব্যাপকতা বিবেচনায় তার জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ড যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোতে মৃত্যুদণ্ডই উপযুক্ত সাজা এবং যেসব অভিযোগে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর খালাসও বাতিল করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।


