চার বছর আগে রাজধানীর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পোশাককর্মী সায়মনকে ছিনতাইয়ের পর হত্যার মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই মামলায় চোরাই মোবাইল কেনার দায়ে অপর এক আসামিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার ১৩তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জাহিদুল ইসলামের আদালত এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন–মো. ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসান। তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। আর চোরাই মোবাইল কেনার দায়ে সুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী সোহেল মিয়া রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপর আসামি সুজন পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ।
বেতন তুলে ফেরার পথে ছিনতাই
মামলার নথি থেকে জানা যায়, নিহত সায়মন মিরপুর-১-এর সনি সিনেমা হলের পেছনে লিবার্টি গার্মেন্টসে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর অফিস থেকে বেতন তুলে দুই সহকর্মী রিফাত হোসেন রাব্বি ও হৃদয় হাসানের সঙ্গে মিরপুর-১ এলাকায় শপিং করতে যান তিনি।
শপিং শেষে রাত ৯টার দিকে বাসায় ফেরার পথে আড়ং শপিং সেন্টারের সামনে এক ব্যক্তি সায়মনকে বলেন, তিনি তার ছোট ভাইকে মেরেছেন। ‘চল, কথা আছে’–এ কথা বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে সায়মন ও তার সহকর্মী রিফাতকে রূপায়ন টাওয়ারের সামনে থেকে রিকশায় তুলে নেয় তিন ছিনতাইকারি।
পরে দারুস সালাম থানার কোনাবাড়ি হয়ে তাদের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাঁচাবাজারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রিফাতকে নামিয়ে দিয়ে সায়মনকে স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিয়ে যায় তারা।
টাকা-মোবাইল না দেওয়ায় ছুরিকাঘাত
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিয়ে তিনজন সায়মনকে চাকু দেখিয়ে তার কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন দিয়ে দিতে বলে। সায়মন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
পরে তার কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। সায়মনের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা শাজাহান শেখ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে দারুস সালাম থানায় হত্যা মামলা করেন।
যেভাবে বেরিয়ে আসে আসামিদের নাম
মামলার তদন্তে দারুস সালাম থানা পুলিশ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইকবাল ও মেহেদী হাসানের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পারে পুলিশ।
তদন্তে ইউসুফের বাসা থেকে সায়মনের মোবাইল বিক্রির টাকা উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ইউসুফ সায়মনের মোবাইলটি সুজনের কাছে দুই হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করার কথাও স্বীকার করে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের পর হত্যার অভিযোগে এবং সুজনের বিরুদ্ধে চোরাই মাল নিজের কাছে রাখার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দারুস সালাম থানার এসআই সোহান আহমেদ।
২০২৩ সালের ২ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আদালত ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। পরে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ এ রায় ঘোষণা করে।


