নোবেল জয়: নারী সাফল্যের একুশ শতক

নোবেল জয়: নারী সাফল্যের একুশ শতক
ছবি: বাসস
Advertisement
Advertisement

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতির মতো বিভিন্ন শাখায় নারীদের অবদানের স্বীকৃতি দিন দিন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে সর্বমোট ৬৭ জন অনন্য নারী ৬৮ বার মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে ফরাসি বিজ্ঞানী মারি ক্যুরি একমাত্র নারী, যিনি ইতিহাসে দুইবার নোবেল পাওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। বিশেষ করে একুশ শতকে পা রাখার পর থেকে এই পুরস্কারের আঙিনায় নারীদের অংশগ্রহণ ও অর্জনের হার পূর্ববর্তী শতাব্দীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পঁচিশ বছরে বিভিন্ন শাখায় বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ ৩৫ জনেরও বেশি নারী এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যা বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার ও মানবাধিকার: নোবেল ইতিহাসে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নারী সম্মাননা পেয়েছেন শান্তি বিভাগে, সর্বমোট ১৯ জন। একুশ শতকে বিশ্বশান্তি, গণতন্ত্র রক্ষা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী নারীরা হলেন-

মালালা ইউসুফজাই (২০১৪): পাকিস্তানের এই তরুণী নারী শিক্ষার অধিকার আন্দোলনের জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে সমগ্র নোবেল ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন।

নার্গিস মোহাম্মদী ও মারিয়া রেসা: ২০২৩ সালে ইরানের নারীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কারাবন্দী অধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদী এবং ২০২১ সালে ফিলিপাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ের জন্য সাংবাদিক মারিয়া রেসা নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

মারিয়া করিনা মাচাদো (২০২৫): ২০২৫ সালে ভেনিজুয়েলায় স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ ভেনিজুয়েলার প্রখ্যাত বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

আরও পড়ুন

বিশ্ব সাহিত্য ও অর্থনীতি

বিশ্ব সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য এ পর্যন্ত ১৮ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

হান কাং (২০২৪): দক্ষিণ কোরিয়ার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হ্যান ক্যাং ২০২৪ সালে প্রথম এশীয় নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এ ছাড়া একুশ শতকে অ্যানি এরনো (২০২২), লুইস গ্লিক (২০২০), অ্যালিস মুনরো (২০১৩) এবং ডরিস লেসিং (২০০৭) সাহিত্যে নোবেল লাভ করেন।

অর্থনীতিতে নারীর বৈপ্লবিক উত্থান: ১৯৬৯ সালে প্রবর্তিত অর্থনীতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র ৩ জন নারী নোবেল মেমোরিয়াল পুরস্কার পেয়েছেন এবং এই ৩ জনই পুরস্কারটি পেয়েছেন একুশ শতকে। ২০০৯ সালে এলিনর অস্ট্রম, ২০১৯ সালে দারিদ্র্য বিমোচনের পরীক্ষামূলক পদ্ধতির জন্য এস্থার দুফলো এবং ২০২৩ সালে বিশ্ব শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ ও উপার্জনের ঐতিহাসিক খতিয়ান তুলে ধরে মার্কিন অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন এই গৌরব অর্জন করেন।

বিজ্ঞান শাখা (পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসা): বিজ্ঞানের জটিল সব রহস্য উন্মোচন ও মানবসেবায় অনন্য অবদানের জন্য চিকিৎসায় ১৩ জন, রসায়নে ৭ জন (৮ বার) এবং পদার্থবিজ্ঞানে ৫ জন নারী নোবেল পেয়েছেন, যার একটি বড় অংশ এসেছে একুশ শতকে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান: ২০২৩ সালে হাঙ্গেরিয়ান-মার্কিন বিজ্ঞানী ক্যাটালিন কারিকো এমআরএনএ (সজঘঅ) প্রযুক্তির বিকাশে অবদানের জন্য এবং ২০২৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেরি ব্রঙ্কো ইমিউনোলজিতে তাঁর যুগান্তকারী কাজের জন্য নোবেল লাভ করেন।

রসায়ন: ২০২০ সালে রসায়নে ইতিহাস গড়ে যৌথভাবে নোবেল পান ফরাসি বিজ্ঞানী এমানুয়েল শারপেনতিয়ে ও মার্কিন বিজ্ঞানী জেনিফার ডাউডনা। ডিএনএ পরিবর্তনের বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘ক্রিসপার ক্যাস-৯’ জিনোম এডিটিং পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

পদার্থবিজ্ঞান: ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড (২০১৮), অ্যান্ড্রেয়া ঘেজ (২০২০) এবং অ্যান ল’হুইলিয়ার (২০২৩) আলো ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল তত্ত্বে অবদানের জন্য একুশ শতকে পদার্থবিজ্ঞানে মেধার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

নারী নোবেলজয়ীদের ইতিহাসে ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পেয়ে মারি ক্যুরি প্রথম নারী নোবেলজয়ী এবং দুইবার নোবেলজয়ী একমাত্র নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। এ ছাড়া মারি ক্যুরির কন্যা আইরিন জোলিও-ক্যুরি ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পান, যা নোবেল ইতিহাসে মা-মেয়ের একমাত্র নোবেলজয়ী জুটি।

বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও মননশীলতার আঙিনায় নারীদের এই ক্রমবর্ধমান সাফল্য ও একুশ শতকের পঁচিশ বছরের জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও যোগ্য পরিবেশ পেলে নারীরাও একক ও যৌথ মেধার জোরে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে এবং নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক ও মানবিক বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad