ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হুমকির কারণে যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিমানগুলো যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড (আরএএফ) ঘাঁটিতে মোতায়েন ছিল। সম্প্রতি ইরান ও কার্যত অচল হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাতেও এসব বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে ওই ঘাঁটির কাছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নেওয়ার সন্দেহে পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ধারণা করছিলাম, সেখানে কোনো হুমকি থাকতে পারে। তাহলে আমি বিমানগুলো সেখানে রেখে দেব কেন? এগুলো সরাতে তো তেমন খরচ করতে হবে না।’
‘যদি আমাদের হুমকি দেওয়া হয় আর আমরা বিমানগুলো সরিয়ে নিই, তাহলে তো ওই ঝুঁকি কিছুটা কমে যায়। আর যারা হুমকি দিয়েছে, তাদের সম্পর্কেও আমরা আসলে জানি’, যোগ করেন ট্রাম্প।
হুমকিদাতারা ইরানের সঙ্গে যুক্ত কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা ইরানের সঙ্গেই যুক্ত হওয়ার কথা।’
এর আগে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের বিমান ঘাঁটি ব্যবহারে মার্কিন সেনাদের অনুমতি ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করেছিল তেহরান। সে সময় তারা জানিয়েছিল, যুদ্ধে সহায়তাকারী যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কড়া মূল্য দিতে হবে।
এদিকে সোমবার ট্রাম্প প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, অতিরিক্ত সতর্কতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নিয়েছে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মনে করি, ইরানিরা গত ৪৯ বছর ধরে যা করে আসছে, এখনো সেটিই করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া। তাই আমরা অত্যন্ত সতর্ক রয়েছি।’
অবশ্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমানগুলো হঠাৎ সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে ইরান-সংশ্লিষ্ট কোনো ষড়যন্ত্র বা হামলাচেষ্টার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই।
তিনি বলেন, পেন্টাগন প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে সামরিক সম্পদ পুনর্বিন্যাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তার ওপর ওয়াশিংটনের আস্থা রয়েছে।
দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত একটি ষড়যন্ত্রের বিষয়ে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা নতুন হুমকির তথ্য পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটোর একটি সামরিক সূত্র সোমবার বলেছে, ‘এখনো মনে করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যে থাকা মার্কিন সম্পদের জন্য ইরান গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।’
ওই সম্ভাব্য হামলাচেষ্টার ঘটনার অনেক দিক এখনো অস্পষ্ট থাকলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম অভিযোগ করেন, কোনো ষড়যন্ত্র হয়ে থাকলে সেটির পেছনে ইরানের সমর্থন থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে এমন কোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘বিদেশি রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা “কথিত সন্ত্রাসীদের” ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাই অনেক কিছু বলে দেয়- ইরান এমনটাই মনে করে, আমি তা নিশ্চিত করতে পারি। আপনারা ভুল জায়গায় সন্দেহ করছেন।’
লন্ডন থেকে ৯০ মাইল বা ১৪৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ফেয়ারফোর্ড ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিগুলোর একটি। বি-১-এর মতো ভারী বোমারু বিমান পরিচালনার উপযোগী অল্প কয়েকটি ইউরোপীয় ঘাঁটির মধ্যে এটি অন্যতম।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগের সামরিক অভিযানগুলোতেও ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এর আগে সেখানে মার্কিন বোমারু বিমান স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদরদপ্তর পেন্টাগনের সূত্রে জানা যায়, চলমান সংঘাতের সময় ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ব্যবহার করে কেবল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। এসব হামলাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে সেসময় তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণাত্মক হামলায় ওই ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় লন্ডন।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিশ্লেষক ক্রিস্টফ বার্গস বলেন, বোমারু বিমানগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ফলে স্বল্প মেয়াদে ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বড় ধরনের বিমান অভিযান পরিচালনার মার্কিন সক্ষমতা কমে যাবে। ফলে হুমকির মাত্রাও কিছুটা কমবে।
বিমানগুলো এখন দিয়েগো গার্সিয়া অথবা উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো ঘাঁটিতে পাঠানো হতে পারে বলে মনে করেন বার্গস। এতে অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রমের জন্য আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে তিনি জানান, এর জন্য সংশ্লিষ্ট ঘাঁটির ধারণক্ষমতা, মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ সেপ্টেম্বর গ্লুচেস্টারশায়ারের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহজনক ভ্যান থামিয়ে রাখার খবর পায় পুলিশ। সে সময় ভ্যান থেকে নেমে মাঠের দিকে দৌড়ে যাওয়ার সময় পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোনো বিস্ফোরক যন্ত্র পাওয়া যায়নি। তবে ওই ভ্যানে কিছু পেট্রোল পাওয়া গেছে।
পরে ওই পাঁচজনকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।


