আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অকেজো মেশিন, বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অকেজো মেশিন, বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ
কার্টুন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ইঁদুরে তার কেটে ফেলার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনের একটি চার মাস ধরে বন্ধ হয়ে আছে।

তারটি বদলাতে খরচ মাত্র ২০ হাজার টাকার মতো। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাইলেও নিজেরা এটি কিনতে বা লাগাতে পারে না। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে কীভাবে সাধারণ ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর পড়ে থাকে, এটি তার এক বড় উদাহরণ।

মেশিনটি মেরামতের জন্য রেডিওলজি বিভাগ থেকে তৎকালীন পরিচালক আসাদুজ্জামানকে চিঠি দেওয়া হয়। তিনি ফাইলটি পাঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে, সেখান থেকে যায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু এই ফাইল চালাচালি শেষ হতে আর কত দিন লাগবে, তা কারও জানা নেই।

রেডিওলজি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম টাইমসকে জানান, যন্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে হাসপাতালের সরাসরি কোনো চুক্তি নেই। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলেও ওই কোম্পানির সঙ্গে নিজেরা কথা বলতে পারে না।

তিনি বলেন, অনেক সময় নষ্ট মেশিন দুই থেকে চার বছর এভাবে পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেগুলো আর মেরামতের যোগ্যই থাকে না।

এই অবস্থা শুধু ঢাকা মেডিকেলের নয়, পুরো দেশের। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত ২৯ জুলাই এক প্রতিবেদনে জানায়, জরিপ চালানো সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় ৫২ শতাংশ সরঞ্জামই গত এক বছর কোনো কাজে আসেনি।

জেলা, উপজেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে এই তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেলেই ১০টি এক্স-রে মেশিনের ৪টি নষ্ট। দুটি এমআরআই মেশিনের একটি এবং ১০টি আল্ট্রাসনোগ্রাফির ৩টিই অকেজো। একটি মেশিন নষ্ট থাকলে চাপ গিয়ে পড়ে সচল থাকা বাকি মেশিনগুলোর ওপর।

রেডিওলজি বিভাগের শিক্ষক মাহফুজা মাহমুদ জানান, ‘একটা মেশিনে দিনে ২৫টির মতো টেস্ট করার নিয়ম। কিন্তু আমাদের করতে হয় অনেক বেশি। ফলে ভালো মেশিনগুলোও অতিরিক্ত চাপে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

নজরুল ইসলামের অভিযোগ, যন্ত্র নষ্ট হলে বিক্রেতা কোম্পানিগুলো বিক্রয়োত্তর সেবা দিতে চায় না। চিঠি দিয়ে আবেদন করার পরও তারা কোনো তোয়াক্কা করে না।

এই জটিলতার কারণ জানিয়ে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘কোম্পানিগুলো হাসপাতাল থেকে সরাসরি টাকা পায় না, তাই তারা আসতেও চায় না। অন্যদিকে হাসপাতাল নিজেরা মেরামত করলে ওয়ারেন্টি বাতিল হয়ে যাবে। পরে বড় কোনো সমস্যা হলে কোম্পানি আর দায়িত্ব নেবে না। এই ঝুকি কেউ নিতে চায় না।’

কোম্পানিগুলো কেন কথা শোনে না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে এককভাবে নির্দেশ দেওয়ার মতো কেউ নেই। তাই কোম্পানিগুলো কারও কথা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মালিক নির্দেশ দিলেই তারা কাজ করতে বাধ্য হয়।’

জেলা হাসপাতালগুলোতে এই চিঠি চালাচালি হতে সময় লাগে আরও বেশি। কারণ, সেখানে অতিরিক্ত দপ্তর সামলাতে হয়। উপজেলা পর্যায়ে এর সঙ্গে যোগ হয় আরও দু-একটি ধাপ।

এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। বাধ্য হয়ে তারা সরকারি মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকায় বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

রোগীর তুলনায় হাসপাতালের মেশিন এমনিতেই কম, তার ওপর বড় একটা অংশ অকেজো। কোনো কোনো হাসপাতালে আবার প্রয়োজনীয় কিট নেই, কোথাও রোগীর চাপে মেশিন অচল। আর এই সুযোগে হাসপাতালের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা।

যে টেস্ট সরকারি হাসপাতালে করতে এক হাজার টাকা লাগে, বাইরে সেটি করাতে খরচ হচ্ছে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা।

প্রায় সকল বড় সরকারি হাসপাতালের দৃশ্য একই রকম। ঢাকা মেডিকেলের ক্যাথ ল্যাব তিন মাস ধরে বন্ধ। ফলে হৃদরোগীদের এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি কিংবা রিং পরানোর কাজ আটকে আছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এমআরআই মেশিন চার বছর ধরে নষ্ট। ভিটামিন ডি পরীক্ষার কিট শেষ হয়ে গেছে দীর্ঘদিন। ৫টি এক্স-রে মেশিনের ২টিই অকেজো। ৯৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে পৌনে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকলেও, ১৬৮টি পরীক্ষার মধ্যে ৫৫টিই এখানে হয় না।

জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে ৪৫টি টেস্টের মধ্যে ৪টি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিন আরএমই, ইউরিন কালচার, থ্রোট সোয়াব কালচার ও ইসিজির মতো জরুরি পরীক্ষাও রয়েছে।

জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে কোন কোন পরীক্ষা করানো যাবে, তার কোনো তালিকা পর্যন্ত টাঙানো নেই। হেল্প ডেস্কের কর্মীরা জানান, তালিকাটি নামিয়ে ফেলা হয়েছে, পরে টাঙানো হবে। তবে কবে টাঙানো হবে, তা তিনি বলতে পারেননি।

ঢাকা মেডিকেলের বক্ষব্যাধি বিভাগের চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে চিকিৎসকরা বাধ্য হয়েই রোগীদের বাইরের ক্লিনিকে পাঠান।

তার বিভাগে মাত্র ২৫টি শয্যা রয়েছে, কিন্তু সংকটাপন্ন রোগী আসে অনেক বেশি। ফলে কাকে রেখে কাকে ভর্তি নেবেন, তা নিয়ে চিকিৎসকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় গরমে শ্বাসকষ্টের রোগীদের হাঁসফাঁস অবস্থা হয়। আর এই বিভাগের স্লিপ ল্যাবটি গত ছয় মাস ধরে বন্ধ।

বেসরকারি সেন্টারে খরচ কয়েকগুণ

সরকারি হাসপাতালে একটি সিটি স্ক্যান করতে লাগে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা, যা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকা।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এমআরআই করতে লাগে ২ হাজার টাকা, অথচ বাইরের সেন্টারে এর দাম ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা।

ভিটামিন ডি পরীক্ষার সরকারি ফি ২ হাজার টাকা। কিন্তু কিট না থাকায় রোগীদের বাইরে গিয়ে দিতে হচ্ছে ৪ হাজার টাকা।

ওষুধসহ এনজিওগ্রাম করতে সরকারি হাসপাতালে খরচ হয় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, যা বেসরকারিতে ১৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকে।

এ কারণে সরকারি হাসপাতালের একটি মেশিন এক দিন বন্ধ থাকা মানে শুধু সেবাবঞ্চিত হওয়া নয়, বরং দরিদ্র রোগীদের পকেট খালি হওয়া।

হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, যন্ত্রপাতির অকেজো দশার পাশাপাশি দক্ষ জনবলেরও মারাত্মক অভাব রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৬ হাজার ৪০৬টি পদের মধ্যে কর্মী আছে ৩ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদই খালি পড়ে আছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই ঘাটতি ২৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ৩৬ শতাংশ।

ফলে দেখা গেছে, কিছু হাসপাতালে আধুনিক মেশিন থাকলেও তা চালানোর মতো দক্ষ মানুষ নেই।

এই আমলাতান্ত্রিক জটকে ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক কাঠামোর ফল বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক প্রশাসনিক নিয়ম আজও ব্রিটিশ আমলের মতোই রয়ে গেছে। সে সময় ইংরেজদের মধ্যে ভারতীয়দের চোর ভাবার এবং সব ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার একটা প্রবণতা ছিল। সেই পুরোনো মানসিকতার কারণেই আজও যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি হয়।’

মুশতাক হোসেন মনে করেন, হাসপাতালগুলোকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী মেশিনপত্র কিনতে বা মেরামত করতে পারে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সমস্যাটি কেবল বাজেটের নয়। তিনি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য দক্ষ ও পেশাদার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি এবং আর্থিক ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে সরিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad