হাসপাতালে যাওয়ার সময় নিজে হাঁটতে পারছিল চার বছরের শিশু আভান। কয়েকদিন পর সেই হাসপাতাল থেকেই ছেলের মরদেহ নিয়ে ফিরতে হয় বাবা-মাকে।
চিকিৎসায় গাফিলতি, ভুল চিকিৎসাপদ্ধতি, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ওষুধ ও শিরায় তরল দেওয়া, পিআইসিইউতে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি না থাকা এবং অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময় কেস সামারি দিতে বিলম্বের অভিযোগ করেছে পরিবার।
তাদের দাবি, সময়মতো চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি হাতে পেলে ২ অক্টোবর রাতেই আভানকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া যেত।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন আভানের বাবা মো. মৃদুল ইসলাম। তিনি বলেন, তারা পুরো চিকিৎসক সমাজ বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নন; তারা চান, তার সন্তানের চিকিৎসায় আসলে কী ঘটেছিল, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
পরিবারের ভাষ্য, ২৮ সেপ্টেম্বর আভানকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখনও সে হাঁটাচলা করছিল। হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথম দিকে তার শারীরিক অবস্থা এমন ছিল না যে তারা সন্তানের জীবন নিয়ে আশঙ্কা করবেন।
পরে তাকে পিআইসিইউতে নেওয়া হলে সেখানেই ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি হয় এবং ৩ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সংবাদ সম্মেলনে আভানের মা তমা বলেন, ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়ার পরও পরিবারের কাছে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ মনে হয়নি। শেষদিকে ছেলের সঙ্গে ভিডিও কলে সবার সঙ্গে কথা বলেছিল।
ডেঙ্গু নেগেটিভ, তবু ডেঙ্গুর চিকিৎসা
আভানের বাবা মৃদুলের দাবি, একাধিক ডেঙ্গু পরীক্ষা নেগেটিভ আসে। প্লেটলেট ২ লাখের বেশি ছিল, শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রাও স্বাভাবিক ছিল এবং শরীরের তাপমাত্রা ছিল ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট। তারপরও ডেঙ্গুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা চলতে থাকে।
পরিবারের প্রশ্ন, পরীক্ষায় ডেঙ্গু না থাকলে কেন সেই অনুযায়ী চিকিৎসা চালানো হলো। কোন পরীক্ষার ভিত্তিতে কোন চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্ত হোক।
এদিকে, আভানকে দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক ও শিরায় তরলের পরিমাণ নিয়েও অভিযোগ করেন তার বাবা। মৃদুলের দাবি, শিশুটিকে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে অতিরিক্ত আইভি ফ্লুইড দেওয়া হয়েছিল।
আভানের অবস্থার অবনতি হলে তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেন মৃদুল। তার দাবি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আভানের জন্য পিআইসিইউর ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়।
তার অভিযোগ, আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স ইউনিভার্সেলের পিআইসিইউর সামনে পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় কেস সামারি ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সময়মতো না পাওয়ায় আভানকে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। মৃদুল বলেন, ‘২ অক্টোবর সন্ধ্যার মধ্যে সামারিটা পেলে সেদিন রাতেই অন্য হাসপাতালে নিতে পারতাম।’
পিআইসিইউতে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক অভিযোগ করেছে পরিবার। তাদের দাবি, সেখানে প্রয়োজনীয় পর্যায়ের সিনিয়র বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট ছিল না। চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল এবং আভানের অবস্থার অবনতি হলেও যথাযথ মেডিকেল বোর্ড করা হয়নি।
আভানের মা তমা অভিযোগ করেন, ছেলের চিকিৎসার সময় অক্সিজেন মাস্ক, ক্যানুলাসহ বিভিন্ন বিষয় সামলাতে পরিবারের সদস্যদেরই বারবার এগিয়ে আসতে হয়েছে। পিআইসিইউর পরিবেশ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
সমঝোতা নয়, তদন্ত চাই
আভানের মৃত্যুর পর বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন মৃদুল। তবে পরিবার কোনো সমঝোতা চায় না বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য, কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক—এটি তাদের উদ্দেশ্য নয়; তারা চান, আভানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসুক।
সংবাদ সম্মেলনে মৃদুলের এক সহযোগী সাংবাদিক আশিক আহমেদকে অপহরণ, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও তোলা হয়। পরিবারের দাবি, এ কারণে তিনি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হতে পারেননি।
আভানের পরিবারের দাবি শুধু চিকিৎসায় ভুল হয়েছে কি না, তা জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা ঘটনার পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করতে চায়।
তাদের দাবিগুলো হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন; আভানের সম্পূর্ণ চিকিৎসা নথি ও কেস সামারি সংরক্ষণ; চিকিৎসকদের ডিউটি রোস্টার যাচাই; প্রেসক্রিপশন, ওষুধ ও ইনজেকশনের বিল পরীক্ষা; সব ল্যাবরেটরি রিপোর্ট পর্যালোচনা; পিআইসিইউর চিকিৎসা ও নার্সিং রেকর্ড যাচাই; হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ; অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের চেষ্টা ও কেস সামারি দেওয়ার সময়ের তথ্য যাচাই; সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তদন্ত; চিকিৎসায় অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা।
মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নই। আমার সন্তান কীভাবে মারা গেল, সেটি জানতে চাই। যদি কারও গাফিলতি থাকে, তার জবাবদিহি চাই।’


