যুদ্ধের মুখেও পারস্য উপসাগরে রেকর্ড তেলের রপ্তানি

যুদ্ধের মুখেও পারস্য উপসাগরে রেকর্ড তেলের রপ্তানি
হরমুজ প্রণালি। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

সেপ্টেম্বরে প্রায় অর্ধেক দিনেই যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পাঠিয়েছে পারস্য উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারকরা।

সোমবার প্রকাশিত শিপিং ডেটায় এ তথ্য উঠে এসেছে। যদিও ট্যাঙ্কারে হামলা এবং লজিস্টিক সংক্রান্ত বিভিন্ন বাধা প্রবাহের এই উচ্চগতি টেকসই হওয়ার পূর্বাভাসকে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তুলছে বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।

কপলার-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বরে এই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সাত দিনের মুভিং অ্যাভারেজ ছিল প্রতিদিন ১৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল। চলতি মাসে ১৪ দিনই রপ্তানির পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব অবস্থা অতিক্রম করেছে।

কপলার জানিয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বরের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে আক্রমণের তিন সপ্তাহ পর, লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগর উভয় অঞ্চল থেকেই সৌদি আরবের তেল লোডিং বৃদ্ধাই মূলত এই উর্ধ্বগতির প্রধান কারণ ছিল।

কপলার-এর তথ্য মতে, ইরান ও ইউএস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের ১২ মাসে এই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ছিল গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠানো, লোহিত সাগর হয়ে এবং ওমান উপসাগরের টার্মিনাল ও জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরিত (শিপ-টু-শিপ) পারস্য উপসাগরীয় তেল এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।

ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর—যা পরবর্তীতে কার্যকর থাকেনি—গত জুন এবং জুলাই মাসেও সামান্য কিছুদিনের জন্য এই চালানের পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব মাত্রার সমান বা তার বেশি ছিল।

শিপিং ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সাও জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় প্রবাহ পুনরুদ্ধার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানির জন্য এর ১৪ দিনের মুভিং অ্যাভারেজ ১৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। আর এটা ১০ বছরের মৌসুমি গড়কেও ছাড়িয়ে গেছে এবং সংঘাতপূর্ব স্তরে ফিরে এসেছে।

সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট জেভিয়ার টাং বলেছেন, সেপ্টেম্বরে দেখা দেওয়া এই মাসভিত্তিক বৃদ্ধির অধিকাংশ অবদানই এসেছে সৌদি আরব থেকে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া বাজারের শেয়ার পুনরায় অর্জনের জন্য রপ্তানি বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সরবরাহ বৃদ্ধি তেলের বাজারের টানাপোড়েন কমাতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে এশীয় রিফাইনারদের জন্য।

আরও পড়ুন

ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত সূত্র এবং বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই আকস্মিক বৃদ্ধির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন করতে আরও বেশি সুপারট্যাঙ্কার চলাচলের প্রয়োজন পড়েছে। তারা আরও যোগ করেন, ওমান উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রক্রিয়াও তার শেষসীমায় পৌঁছেছে।

আগস্টে বাগদাদ তাদের ট্যাঙ্কারগুলোর হরমুজ দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানের অনুমতি লাভ করার পর, ইরাকের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘অয়েল ট্যাঙ্কার কোম্পানি’ এবং কিছু রিফাইনারি প্রণালীর ভেতরের অংশ থেকে বাসরা অপরিশোধিত তেল লোড করার জন্য ট্যাঙ্কার চার্টার করেছে। সেপ্টেম্বরে প্রণালীটি ত্যাগ করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-র চালানও বেড়েছে, যা ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।

তবে এই পুনরুদ্ধার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সাথেই এসেছে। শিপিং ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘মারিস্কস’ শনিবার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে চলাচল তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে হরমুজ অতিক্রমকারী জাহাজগুলো ‘উচ্চমাত্রার এবং ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত কাইনেটিক থ্রেট’-এর মুখোমুখি হচ্ছে।

মারিস্কস আরও জানায়, গত সপ্তাহে অন্তত সাতটি ঘটনায় ট্যাঙ্কারে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

১ অক্টোবরে প্রণালিতে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) ‘কাজিমাহ ৩’ এক অজানা ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জাহাজে আগুন ধরে যায়। এর মালিক কুয়েত অয়েল ট্যাঙ্কার কোম্পানি কোনো মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

মারিস্কস সোমবারে আরও জানিয়েছে, ওমানের জাজিরাত উম আল ফায়ারিনের উত্তর-পূর্বে প্রণালি অতিক্রম করার সময় ৪ অক্টোবরে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী অ্যাফরাম্যাক্স ট্যাঙ্কার ‘লিপসি’ একটি অজানা প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এর ইঞ্জিন রুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এর ম্যানেজার ডায়ানাকম তৎক্ষণাৎ মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। উভয় ট্যাঙ্কারের নাবিকরা নিরাপদ রয়েছেন এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা জানিয়েছে, ২ অক্টোবরের পর থেকে হরমুজ প্রণালি বা এডেন উপসাগরে প্রতিদিন অন্তত একটি করে হামলা হয়েছে।

মারিস্কস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এই হামলার ধারাবাহিকতা বাছাই করা নির্দিষ্ট মার্চেন্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানি বাহিনী একটি পূর্বনির্ধারিত এনগেজমেন্ট এরিয়া বা ‘কিল বক্স’-এ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে, যার ফলে অস্ত্রগুলো এই এলাকার ভেতর থাকা রাডার সিগনেচার শনাক্ত করে সেগুলোকে লক্ষ্য বানাচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, প্রতি দিনে এই প্রণালি দিয়ে সাধারণত ট্যাঙ্কার, গ্যাস ক্যারিয়ার, বাল্কার এবং কনটেইনার জাহাজসহ প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত, যা বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad