প্রায় ১৭ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী ফাহামিদা শারমিন। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে এবার নিজের একটি ঠিকানা গড়তে চান। তার পছন্দের এলাকা মিরপুরের পল্লবী ও এর আশপাশ। একটি অ্যাপার্টমেন্টের খোঁজে এসেছেন রাজধানীর বসতি মেলায়।
ইনটেক প্রোপার্টিজ লিমিটেডের একটি প্রকল্প তার পছন্দ হয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টলও ঘুরে দেখতে চান। অবস্থান, দাম ও অর্থ পরিশোধের শর্ত মিলিয়ে তারপর বেছে নেবেন নিজের বাড়ি।
‘আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ। অনেক দিনের সঞ্চয়ের পর একটা ফ্ল্যাট কেনার চিন্তাভাবনা করছি। অনেক সময় শুনি, মানুষ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে ঠকে যায়। তাই দেখেশুনে কিনতে এখানে আসা’, বলেন ফাহামিদা।
নিজের বাড়ির স্বপ্নের সঙ্গে এমন সতর্ক হিসাবও জায়গা পাচ্ছে বসতি মেলায়। বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সোমবার শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন। চলবে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত। আবাসন, নির্মাণ ও ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–রাজউকসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা মিলিয়ে মেলায় মোট ১৫৭টি স্টল রয়েছে।
মেলার স্টলগুলোতে ফ্ল্যাট ও প্লটের বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে জানাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। কোথায় প্রকল্প, কতটুকু আয়তন, দাম কত এবং কবে হস্তান্তর হবে–এসব তথ্যের সঙ্গে ক্রেতারা জানতে চাইছেন বুকিং, ডাউন পেমেন্ট ও কিস্তির শর্তও। একই জায়গায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব তুলনা করার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
নিউ ভিশন অ্যাপার্টমেন্টসের ডেপুটি ম্যানেজার ইমরান শেখ জানান, তারা প্লট ও অ্যাপার্টমেন্ট–দুই ধরনের সম্পত্তিই বিক্রি করছেন। তাদের অধিকাংশ প্রকল্প বিক্রির জন্য প্রস্তুত। ডাউন পেমেন্ট ও কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। সাধারণভাবে প্রায় এক বছর সময় পাওয়া গেলেও প্রকল্পভেদে পরিশোধের সময়সূচিতে পার্থক্য আছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্লটের তিনটি প্রকল্প হলো নিউ ভিশন ইকো ভিলেজ, নিউ ভিশন কিংডম ও নিউ ভিশন আইল্যান্ড। ইমরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবস্থানভেদে প্রতি কাঠা জমির দাম প্রায় ৮ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা। তবে ক্রেতাকে ন্যূনতম তিন কাঠা জমি কিনতে হবে।
অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রেও রয়েছে আয়তন ও দামের বৈচিত্র্য। তিনি জানান, তাদের ১ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রকল্প ও অবস্থানভেদে দাম প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
প্লটের প্রতি আগ্রহের ব্যাখ্যায় ইমরান বলেন, কেউ বিনিয়োগের জন্য জমি কিনতে চান, আবার কেউ নিজের জমিতে বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এই দুই ধরনের চাহিদার কারণে অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি প্লটের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে।
অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টসের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ ইয়াসিন বিন জানান, তাদের প্রদর্শিত ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ বর্গফুটের তিন বেডরুমের ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ৩ কোটি টাকা।
শেলটেকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জানান, তাদের আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পাশাপাশি প্রিমিয়াম ‘স্যাফায়ার সিরিজ’ এবং জমির প্রকল্পও রয়েছে। অবস্থান ও আয়তনভেদে অ্যাপার্টমেন্টের দাম আলাদা। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে শুরু।
তিনি আরও জানান, প্রস্তুত ফ্ল্যাটের পাশাপাশি বিভিন্ন মেয়াদে হস্তান্তরের প্রকল্পও রয়েছে। প্রকল্পভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং দুই থেকে পাঁচ বছরের কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ আছে। ব্যাংকের হোম লোনের মাধ্যমেও অর্থায়নের সুযোগ নেওয়া যায়।
ঢাকার বাইরেও নিজের ঠিকানা খুঁজতে পারেন ক্রেতারা। রিয়েল ক্যাপিটার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ডিবা জানান, ঢাকার পাশাপাশি খুলনায়ও তাদের অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। অবস্থান ও আয়তনভেদে ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ১ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকা।
ভবনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তার দাবি, তাদের প্রকল্পের ভবনগুলো ৮ দশমিক ২৫ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এ দাবির সমর্থনে প্রকৌশলগত নথি এই প্রতিবেদনের জন্য যাচাই করা হয়নি।
ফ্ল্যাট ও প্লটের পাশাপাশি মেলায় রয়েছে ব্যাংক এবং সিমেন্টের স্টলও। ফলে বাড়ি কেনার অর্থায়ন ও নির্মাণসামগ্রী সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে একই আয়োজনে। নিজের জমিতে বাড়ি করতে আগ্রহীদের জন্য নির্মাণসামগ্রীর তথ্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
বাড়ি কেনার হিসাব অবশ্য মূল দামেই শেষ হয় না। পার্কিং, ইউটিলিটি সংযোগ, নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রযোজ্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় কত হবে, তা জানা প্রয়োজন। বসবাস শুরুর পর রক্ষণাবেক্ষণের মাসিক খরচও পরিবারের বাজেটের অংশ হয়ে যায়। ব্যাংকঋণ নিলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সুদ, কিস্তি ও ঋণের মেয়াদের হিসাব।
ফাহামিদা শারমিন তাই একটি প্রকল্প পছন্দ হলেও আরও স্টল ঘুরে দেখতে চান। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে বাড়ি কেনার আগে তার প্রয়োজন দাম ও অবস্থানের সঙ্গে নির্ভরযোগ্যতার হিসাব মেলানো। নিজের ঠিকানার খোঁজে মেলায় এসে সেই সিদ্ধান্তের জন্যই তথ্য সংগ্রহ করছেন তিনি।


