‘আগে ঘরে মেয়ে হলে সবাই ভাবত, দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। এখন আমরা চাই মেয়ে আগে লেখাপড়া শেষ করুক, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করুক। কিন্তু মেয়ে একটু বড় হতেই আত্মীয়স্বজন ও সমাজের চাপের কারণে বিয়ের চিন্তাটাই ঘুরেফিরে সামনে আসে’, বলছিলেন এক কন্যা শিশুর বাবা মোমেনুল ইসলাম।
তিন দশক আগেও পরিবারে মেয়ে শিশু জন্মালে অসন্তুষ্ট হওয়ার ঘটনা নিয়ে অনেক আলোচনা হতো। মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সরকারকে তখন ‘মীনা’ কার্টুন প্রচার করতে হয়েছিল। তবে সময় এখন অনেকটাই বদলেছে।
কিশোরগঞ্জের নগুয়া এলাকার ইলেকট্রিশিয়ান মো. হারুন এক ছেলের বাবা। তিনি আবার সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এবার একটি মেয়ে আশা করছেন।
টাইমস অব বাংলাদেশকে হারুন বলেন, ‘এখন বেশিরভাগ মানুষই পরিবারে মেয়ে সন্তান চান।’
এই পরিবর্তনের পেছনে নানা কারণ রয়েছে। সামাজিক পরিবর্তন, মাদকের বিস্তার, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া আর সামাজিক বন্ধন শিথিল হওয়ায় ছেলেদের সামলে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি মেয়েদের উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগও এই আগ্রহ বাড়িয়েছে বলে জানান হারুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সংবাদমাধ্যমে মেয়েদের নিয়ে বাবা-মায়ের ভালোবাসার প্রকাশ এখন বেশ পরিচিত দৃশ্য। তবে এই ছবির অন্য পিঠে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা।
মেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শারীরিক নিরাপত্তা, বিকাশের সমান সুযোগ এবং শিক্ষা শেষে চাকরি পাওয়া নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা কিছুতেই শেষ হয় না।
স্কুল শিক্ষক নাজনিন সুলতানা টাইমসকে বলেন, ‘মেয়ে হওয়ায় এখন আর কারও আফসোস হয় না। বরং মনে হয়, ছেলেকে যেভাবে পড়াতাম, মেয়েকে তার চেয়েও ভালোভাবে পড়াতে হবে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের পাশাপাশি ভয়ও বাড়ে–মেয়েটা নিরাপদ থাকবে তো? নিজের পছন্দমতো জীবন বেছে নিতে পারবে তো? আমরা না থাকলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে তো?’
সাইফুল আজিম নামে এক কন্যা শিশুর বাবা টাইমসকে বলেন, ‘মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে চাই। কিন্তু সে নিরাপদে থাকবে কি না, এই ভয়টা সব সময় তাড়া করে।’
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে অন্তত ২৩৮ জন শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ৮৮ জন নারী ও কন্যা শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১৭ জনকে এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয় আরও ১৭৩ জন কন্যা শিশু।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। ফলে এর বাইরে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
সন্তানের নিরাপত্তার চিন্তায় আকুল এক মা আফসানা জাহান বলেন, ‘আমরা চাই মেয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিক। কিন্তু সমাজ সব সিদ্ধান্ত সহজভাবে নেয় না। মেয়েকে স্বাধীনতা দিলে একদিকে যেমন ভালো লাগে, অন্যদিকে বিপদে পড়ার ভয়ও তাড়া করে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক টাইমসকে বলেন, ‘নিরাপত্তাহীনতা ও যৌন হয়রানিই মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুবাহ জাহওয়া পূর্বা টাইমসকে তার শৈশব থেকে তরুণ বয়সে পা দেওয়ার বিভিন্ন সংকটের কথা জানান।
ছোটবেলায় মা-বাবার গভীর ভালোবাসা ও মনোযোগ পেয়ে বড় হয়েছেন পূর্বা। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা বদলে গেছে।
তিনি জানান, রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা থেকে শুরু করে পোশাক পরা বা আচরণ—সবকিছুতেই তাকে নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়।
তার মতে, সমাজের চোখে মানানসই পোশাক ও আচরণ মেনে না চললে যেন নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনা হয়, এমন একটি ভয় কাজ করে। এমনকি কোথাও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলেও কেবল মেয়ে হওয়ার কারণে নিরাপত্তার কথা ভেবে পিছিয়ে আসতে হয়। রাস্তা বা গণপরিবহনে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়ার ভয়ে অনেক সময় চুপ থাকতে হয়।
শিক্ষায় এগিয়ে, পিছিয়ে চাকরিতে
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফলও ভালো। তবে উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার ডাটা পোর্টাল অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ ছিল ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও এই বড় ব্যবধান দেখা যায়। সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসে ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২২ জন নারী আবেদন করলেও প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন ৯০ হাজার ২৬২ জন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্তভাবে টিকতে পেরেছেন মাত্র ২৯৪ জন নারী, যেখানে পুরুষ টিকেছেন ১ হাজার ৪০ জন।
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৩তম বিসিএসে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ১ লাখ ৭৫ হাজার। কিন্তু চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ২ হাজার ১৬৩ জনের মধ্যে নারী ছিলেন ৪২১ জন বা ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
পিএসসি সদস্য ফেরদৌস আরফিনা ওসমান জানান, সরকারি প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণের হার ক্রমান্বয়ে কমছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার মতে, পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে মেধাবী নারীরা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও উপযুক্ত পরিবেশ পান না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও একই ব্যবধান দৃশ্যমান। শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩ অনুযায়ী, মোট শিক্ষকের মধ্যে নারী মাত্র ২৯ দশমিক ১১ শতাংশ।
অধ্যাপক তানিয়া হকের মতে, ‘নারীকে এখনো মূল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে না দেখে তার প্রজনন ভূমিকা ও সংসারের কাজকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও রান্না, সন্তান সামলানো ও প্রবীণদের দেখাশোনার মতো গৃহস্থালি কাজের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার বা পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাবে কর্মজীবী নারীদের ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হচ্ছে। দুর্যোগ বা সংকটের সময়েও নারীরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।
সাংবাদিক শাহনাজ শারমিন টাইমসকে বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও বিচারহীনতার কারণে কিশোরী ও তরুণীরা সহিংসতার মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে। শিক্ষা বা চাকরির প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলেও আমাদের গণপরিবহন ও পাবলিক স্পেস এখনো নিরাপদ নয়। এই পরিস্থিতিতে পরিবারগুলো সুরক্ষার অজুহাতে মেয়েদের ওপর নানারকম বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়। আর এই নিয়ন্ত্রণ মেয়েদের আরও দুর্বল ও অসহায় করে তোলে।’
সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কতটুকু
বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের মালিকানাধীন জমির ৬২ শতাংশই এসেছে স্বামীর পরিবারের মাধ্যমে। অর্থাৎ, বাবা-মায়ের সম্পত্তির বড় অংশ এখনো ছেলেরাই ভোগ করছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘পরিবারে কন্যা শিশুর গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও সম্পত্তির অধিকারে সেই পরিবর্তন আসেনি।’
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ২৮(২) অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে নারীদের সমান সুযোগের কথা বলা হলেও উত্তরাধিকার আইনে রয়ে গেছে বড় বৈষম্য।
হিন্দু ধর্মে মেয়েরা পারিবারিক সম্পত্তির অধিকার পান না। আর মুসলিম আইনে বাবার সম্পত্তিতে নারী পান ভাইয়ের অর্ধেক অংশ।
বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে কেবল উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেই ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে দেওয়ানি বা ফৌজদারি অন্য কোনো আইন ধর্মীয় বিধির ওপর নির্ভর করে না।
এদিকে নারীদের আর্থিক স্বাধীনতাও সীমিত। ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নারীর ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ছিল ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ।


