চাকার ঘূর্ণনে শেষ প্রহর, সমাপ্তির পথে চিরায়ত ঐতিহ্য

চাকার ঘূর্ণনে শেষ প্রহর, সমাপ্তির পথে চিরায়ত ঐতিহ্য
হাতখোলা গ্রামের কুমোরপাড়া। ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার হাতখোলা গ্রামের কুমোরপাড়ায় বেড়েছে ব্যস্ততা। ছোট্ট এই কারিগর সম্প্রদায় এখনো বংশপরম্পরায় চলে আসা মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছে। মাটি আর মানুষের হাতের মেলবন্ধনে প্রতিদিনই সেখানে তৈরি হচ্ছে নানা রকমের প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

দুর্গাপূজার কয়েক সপ্তাহ আগে কুমোরদের ব্যস্ততা চরমে পৌঁছে যায়। এ সময় পূজা উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন মেলা বসে। এসব মেলায় বিক্রির জন্য তারা মাটি দিয়ে রান্নার হাঁড়ি, কলসি, ব্যাংকসহ নানা ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করেন। কুমোর পাড়ার আনাচে-কানাচে তখন শুধু কুমোরের চাকার ছন্দময় ঘূর্ণন আর ভেজা মাটিকে নানা আকৃতি দেওয়ার দৃশ্যই চোখে পড়ে। কারিগরের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় ভেজা মাটি ধীরে ধীরে পরিচিত সব আকৃতি পেতে থাকে। মনে হয়, মাটির সঙ্গে তাদের এই বোঝাপড়া যেন কোনো এক পুরোনো উত্তরাধিকার–যার পাঠ তারা শৈশবেই পেয়েছেন, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছেন।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

কারিগররা জানান, পূর্বপুরুষের শেখানো কৌশলে চাকা ঘুরিয়ে মাটি দিয়ে তৈরি এই শিল্পের উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতাই এখন যেন অনিশ্চয়তার মুখে। কুমোরদের অনেকেরই আশঙ্কা, তারাই হয়তো এই পেশার শেষ প্রজন্ম। সন্তানদের মধ্যে মৃৎশিল্প নিয়ে আগ্রহ কমে যাওয়ায় একদিন হয়তো থেমে যাবে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই কাজ। এর পাশাপাশি সস্তা প্লাস্টিকের পণ্যের সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিকের সামগ্রী এখন অধিকাংশ পরিবারের নিত্যদিনের ব্যবহারে ব্যাপকভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

কুমোরপাড়ার কাজ চলছে। ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

ঐতিহ্যবাহী মাটির পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় সারা বছর মৃৎশিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান কারিগররা। অনেকের কাছে এখন দুর্গাপূজার আগের কয়েক সপ্তাহই বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।

আরও পড়ুন

এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও কুমোররা মাটি নিয়ে কাজ করে চলেছেন। এভাবেই তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

তাদের হাতেই কারুশিল্পের এমন কাজ হতে পারে, যা যন্ত্র কখনোই পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না। শৈশব থেকেই শেখা সেই কারুশিল্পে মিশে আছে ধৈর্য ও মমতা, বাবা-মায়ের হাত থেকে সন্তানের হাতে পৌঁছে যাওয়া কুমোরের চাকার ছন্দ, আর নিজের হাতে মাটি ছুঁয়ে প্রয়োজনীয় কিছু সৃষ্টি করার এক অনন্য গর্ব।

ছবি: বিপুল আহমেদ/ টাইমস

আপাতত চুল্লিতে আগুন জ্বলছে, কুমোরের চাকা ঘুরছে, আর ভেজা মাটি একের পর এক নতুন রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এই চাকার ঘূর্ণন আর কতদিন চলবে, তা অনিশ্চিত। পরবর্তী প্রজন্ম কি পূর্বপুরুষের এই পেশা বেছে নেবে? নাকি একদিন থেমে যাবে চাকার ঘূর্ণন, নিভে যাবে চুল্লির আগুন? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। আর সেই সঙ্গে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে হাতখোলার সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যের ভবিষ্যতও

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad