পদ্মাসেতু পার হয়ে দক্ষিণ প্রান্তের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকার পদ্মার পাড় থেকে শিবচর উপজেলার কাওড়াকান্দি ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটারের নদী শাসন বাঁধ। পদ্মা সেতু তৈরির সময়ই এটি নির্মাণ করা হয়। এই নদীশাসন বাঁধই এখন দর্শনার্থীদের প্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে। পদ্মাসেতু এবং নদীকে কেন্দ্র করে শিবচরের কাওড়াকান্দি থেকে পদ্মাসেতুর নিচের জাজিরা পয়েন্ট পর্যন্ত এলাকা যেন হয়ে উঠেছে এক ভিন্নধর্মী পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন বিকালে শত শত দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখোর থাকে এই এলাকার পদ্মাপাড়। এখানে দিন দিন দর্শনার্থীদের পদচারণা যেন বেড়ে চলছে। এতে করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয়-রোজগারের ক্ষেত্রও বাড়ছে বলে জানান স্থানীয়রা। নদী শাসন বাঁধের পদ্মার পাড় ও চরাঞ্চল ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভবনা রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত চার-পাঁচ বছর ধরে শিবচরের কাওড়াকান্দি ঘাট সংলগ্ন পদ্মার পাড় এবং পদ্মাসেতুর জাজিরা পয়েন্টের নদীপাড় ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে অবসর সময় কাটানোর জন্য দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠছে। নদী শাসন বাঁধে বসে গল্প করা, ডিঙ্গি নৌকায় নদীতে ভেসে বেড়ানো আবার দলবেঁধে পদ্মায় গোসল করার দৃশ্যও দেখা যায়। দূর দূরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন, বন্ধু, সহপাঠীদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পদ্মা ভ্রমণে শিবচরের কাওড়াকান্দি এলাকায় আসেন ভ্রমণপ্রেমীরা। এ ছাড়াও, ঈদ এবং পূজার ছুটিতে এখানে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। পদ্মায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য ট্রলার এবং ডিঙ্গি নৌকা রয়েছে। ভাড়া করে পদ্মাসেতু এবং আশেপাশের চর এলাকায় ঘুরে বেড়ান দর্শনার্থীরা।
স্থানীয়রা জানান, পদ্মাসেতু তৈরির সঙ্গে সেতু থেকে শুরু করে শিবচরের মাদবরেরচর পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার নদীর পাড়ে নদীশাসন বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধ দেওয়ার পরই লোকজনের কাছে এই এলাকাটা দর্শনীয় হয়ে উঠতে শুরু করে। এখানে নিরিবিলি সময় কাটানো যায়। গরমের তীব্রতার মধ্যেও নদীর পাড়ে মৃদুমন্দ বাতাস থাকে। বিকালে কোনো কারণ ছাড়াই স্থানীয়রা নদীর পাড়ে ঘুরতে আসেন। এভাবেই শিবচরের পদ্মার পাড় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এখন দূর থেকেও লোকজন আসে এখানে।

স্থানীয়রা আরও জানান, দূর-দূরান্ত থেকে লোকজনের ঘুরতে আসার ফলে এখানকার স্থানীয়দের জীবিকার একটা উপায় তৈরি হয়েছে। আগে এখানে ঘাট ছিল। উপার্জনের নানা পথ খোলা ছিল। সেতু চালুর পর ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে হঠাৎ করেই অসংখ্য মানুষের জীবিকা উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে যায়। তবে নতুন করে আবার উপার্জনের পথ খুলছে। ঈদের সময় হাজার হাজার মানুষের ভিড় থাকে এই পদ্মাপাড়ে! যেন সমুদ্র পাড়ে ঘুরতে এসেছে মানুষ!
সরেজমিন শিবচরের কাওড়াকান্দি ঘাট সংলগ্ন পদ্মাপাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, নদী শাসন বাঁধের পুরোটা অংশজুড়ে ভ্রমণপ্রেমী মানুষের ভিড়। নদীতে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়েও ঘুরতে দেখা গেছে মানুষকে। দর্শনার্থীদের আগমনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভাসমান অসংখ্য দোকান। দলবেঁধে তরুণদের ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে নদীর পানিতে। যেন একটুখানি প্রশান্তি খুঁজে নিতে পদ্মার পাড়ে ছুটে এসেছে হাজারো মানুষ!
এদিকে পদ্মাসেতু সংলগ্ন এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট। পদ্মাভ্যালী, ইলিশ পোলাও, কলাপাতা রেস্টুরেন্টসহ ছোট-বড় বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট রয়েছে এখানে। এ ছাড়াও, পদ্মাসেতু সংলগ্ন নদীপাড়ের নাওডোবা এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত বিলাশবহুল রিসোর্ট রয়েছে। পদ্মা এ ডব্লিউ টি রেস্ট হাউস নামের রিসোর্টেও ভ্রমনপ্রেমীরা আসেন পদ্মাদর্শনে।

এ ছাড়াও, পদ্মাপাড়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে শিবচর উপজেলা উন্নয়ন তহবিল থেকে ১ হাজার ৩০০ গাছের চারা লাগানোর উদ্যোগ এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। গত জুলাই মাসে শিবচরের কাওড়াকান্দি ঘাট এলাকার নদী শাসন বাঁধ থেকে নাওডোবা পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথে লাগানো হয় কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কদম, জারুল, সোনালু, পলাশসহ নানা প্রজাতির গাছের চারা।
স্থানীয় মো. রুবেল মোড়ল বলেন, ‘আমাদের এই পদ্মাপাড়ে এখন কক্সবাজার বা কুয়াকাটার ফিল পাওয়া যায়! শিবচরসহ আশেপাশে কোনো বিনোদন কেন্দ্র নাই। এ কারণে দিন দিন পদ্মার পাড় যেন বিনোদন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ঈদের সময় লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ঘুরতে আসে এখানে। গত ঈদের পর ঢাকা থেকে সাংবাদিক নেতারাসহ শতাধিক সাংবাদিক এসেছিলেন পদ্মানদীতে ঘুরতে। এ ছাড়া সারা বছরই ঘুরতে আসা মানুষ দেখা যায়।’
কলেজ ছাত্র মো. মইন বলেন, ‘নদীর পাড়ের সৌন্দর্য ভিন্নরকম। এখানে বিকালে সুর্যাস্ত দেখা যায়। পানিতে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য ডোবে। হালকা বাতাস থাকে সবসময়। ভালো লাগে।’

স্থানীয় নৌকার মাঝিরা বলেন, ‘আমাদের ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা রয়েছে। দর্শনার্থীরা ভাড়া নিয়ে নিজেরাও নৌকা চালাতে পারে। আবার আমরাও নৌকায় করে নদীতে ঘুরাই। ঈদ এবং পূজার ছুটিতে প্রচুর লোক হয় এখানে।’
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান, ‘পদ্মাপাড়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে গাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে পদ্মাপাড়ের কাওড়াকান্দি ঘাট এলাকা থেকে কয়েক কিলোমিটরজুড়ে এই গাছ লাগানো হয়েছে। গাছগুলো বড় হলে এখানকার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলবে। তা ছাড়া, পদ্মার তীরে ভ্রমণপ্রেমীদের আগমন দিন দিন বেড়ে চলেছে। যা এই এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন ঘটাবে।’


