প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, এমন স্বস্তিইতো চাই। আশঙ্কা ছিল, রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ডে জড়িতরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবেন কি না। কিন্তু আপনি শেষ পর্যন্ত যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাতে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
আপনি রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ডের মূল কুশীলব হিসেবে, অন্তত এখন পর্যন্ত যাকে ভাবা হচ্ছে, বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্তও চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ গত বুধবার বলেছেন, রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ডের তদন্ত চলছে। তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে মিষ্টিকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং সেটি দু-এক দিনের মধ্যেই।
মানুষ আসলে আপনার কাছ থেকে এমন পদক্ষেপই প্রত্যাশা করে।
অজানা নয়, রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ডে আরও কয়েকজনের নাম বারবার সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও রয়েছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন অপরাধে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। কোথাও কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে, কোথাও নেতাকর্মীদের বহিষ্কার বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা আরও স্পষ্ট—শুধু দলীয় ব্যবস্থা নয়, অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কমিটি বিলুপ্ত করা বা কাউকে বহিষ্কার করাই যেন অপরাধের শেষ পরিণতি না হয়। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ডের সঙ্গে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সম্পৃক্ততা থাকলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রত্যাহার বা বদলি যথেষ্ট নয়; অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যদি কোনোভাবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যান, তাহলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। অন্যদিকে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে সেটি রাষ্ট্র ও সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে।
আমরা দেখি, এই দেশে প্রতিদিন অনেক ঘটনাই ঘটে। কোনো একটি ঘটনা কিছুদিন মিডিয়ার আলোচনায় থাকে। এরপর আরেকটি বড় ঘটনা এসে আগের ঘটনাটিকে আড়াল করে দেয়। একসময় মানুষ আগের ঘটনাটি ভুলে যায়। আর সেই সুযোগেই অনেক অপরাধী আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়।
এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী ভবিষ্যতে ক্ষমতা, পদ, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে। অন্যথায় তারা পূর্বের অপরাধের ধারাবাহিকতা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। অপরাধের রাশ টেনে ধরতে হলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নিজের দলের একজন মহিলা এমপির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত আপনি নিয়েছেন, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। মানুষ প্রত্যাশা করে, এই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষপাত থাকবে না।
আপনার এই সিদ্ধান্ত অপরাধীদের নিবৃত্ত করতে ভূমিকা রাখবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা। রাড্ডা হাসপাতাল কাণ্ড ঘিরে যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নতুন ভোরের অপেক্ষায় ১৮ কোটি মানুষ এবং ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ।


