ঢাকার উত্তর বাড্ডার মাছের বাজারে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন রাবেয়া সুলতানা। চোখের সামনে সাজানো তেলাপিয়া, কই, পাঙ্গাশ কিন্তু কোনোটির দামই তার মাসিক ১২ হাজার ৫০০ টাকা আয়ের হিসাবের সঙ্গে মিলছে না।
একটি পোশাক কারখানার এই শ্রমিকের কাঁধে বাসাভাড়া, খাবার ও দুই সন্তানের খরচ। বাজারে এসেছিলেন সন্তানদের জন্য একটু মাছ কিনবেন বলে, কিন্তু দাম শুনে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সবচেয়ে কম দাম দেখলাম তেলাপিয়া ২৫০ টাকা। কিন্তু এটাও এখন অনেক বেশি। কোথায় যাব ভাই? দুই সন্তান আছে, মাছ খেতে চায়। এত দাম বাড়লে কীভাবে খাব? আগে যেটুকু কিনতাম, এখন সেটাও কমাতে হচ্ছে।’
তেলাপিয়া-পাঙ্গাশ, চাষের কই বা এ জাতীয় যে মাছগুলো বছরের পর বছর ধরে নিম্ন আয়ের মানুষের আমিষের পুষ্টি জুগিয়ে আসছে, সেগুলোর দাম গত কয়েক মাসে এতটাই বেড়েছে, যেটি রাবেয়াদের পাত থেকে মাছ উধাও করে দিচ্ছে।
শুক্রবার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, তেলাপিয়ার কেজি ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙ্গাশ ২২০-২৩০ টাকা। ছোট আকারের রুইয়ের দামও ৩০০ টাকা, বড় হলে ছাড়িয়ে যায় ৫০০, কাতলার দামও একই রকম। এটি কারওয়ানবাজারের দাম হলেও নগরীর অন্য বাজারে এর সঙ্গে ৫০ থেকে ১০০ টাকা যোগ হয় প্রতি কেজিতে।
চাষের কইয়ের দামও উঠেছে ৩০০ টাকায়, সস্তার সামুদ্রিক পোয়াও আড়াইশ ছাড়িয়ে, যে লইট্যা দুই বছর আগেও ১০০ বা ১২০ টাকায় পাওয়া যেত, তাও এখন দুইশ ছাড়িয়েছে। চাষের শিংয়ের দামও আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা মো. করিম ও সুলতান মিয়ার মতে, প্রবল বৃষ্টিতে জেলেরা নদীতে যেতে পারছেন না, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতাও কম। সরবরাহ অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় দাম কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা দাউদ রহমান কারওয়ান বাজারের দাম দেখে বলেন, ‘আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ধার-কর্জ করে মাসের খরচ মেলাতে হচ্ছে। সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
বনশ্রীর অটোরিকশাচালক হাবিব রহমানের বলেন, ‘দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করা মানুষের কাছে কেজিতে ২ টাকা বাড়লেও অনেক চাপ। এই রীতি বন্ধ না হলে আমাদের টিকে থাকা মুশকিল।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন অজুহাত পেয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে জীবন-জীবিকার সম্পর্ক আছে ঠিকই, কিন্তু বাজারে ঢালাওভাবে যৌক্তিক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি দাম বাড়ানো হচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবু তোরাব মো. আবদুর রহিম বলেছেন, ‘খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য খাওয়ার পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে মানুষের আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি, এমনকি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্য কিনতে চলে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেটসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে যাচ্ছে না।’
কিন্তু চাষের মাছের দাম এত বাড়ছে কেন–এই প্রশ্নে ময়মনসিংহের মাছচাষি বিশ্বজিৎ দত্ত ভৌমিক টাইমসকে বলেন, গত তিন মাসে ফিডের দাম তিন দফায় বেড়েছে, প্রতিবার কেজিতে ৩ টাকা করে।
তার খামারটি দেড় একরের বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। সেখানে তেলাপিয়ার পাশাপাশি ট্যাংরা, পাঙ্গাস, বাংলা মাছ, রুই ও কাতলসহ নানা মাছ রয়েছে।
ওষুধ ও প্রোবায়োটিকের দামও বাড়ছে বলেও জানান বিশ্বজিৎ। আরও আছে বিদ্যুৎ বিলের চাপ। মাছের খামারেও যে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগে, সেটি অনেকেরই অজানা। তবে আধুনিক চাষ পদ্ধতিতে মোটর দেয় অক্সিজেন নিতে হয় পানিতে। গত মাসে তার বিদ্যুৎ বিল আগের মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, বলেন তিনি।
ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্নের কথা বললেন এই খামারি। বলেন, আগে কোনো একটি ওষুধ মাসে পাঁচ কেজি ব্যবহার করলে একটি পুকুরের জন্য যথেষ্ট হতো। এখন মাসে ৩০ কেজিও কেন লাগছে, সেই প্রশ্নের জবাব তার কাছেও নেই।
খাবারের দাম বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন খাবার ব্যবসায়ীদের সমিতি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (এফআইএবি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. আহসানুজ্জামান।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আগে ৪১৮-৪২০ ডলার টন দরে সয়াবিন মিল আমদানি হতো, যার স্থানীয় মূল্য ছিল ৫৪-৫৫ টাকা। এখন তা ৬৫ টাকায় উঠেছে। নতুন এলসিতে ৫০০ ডলারে আমদানি করতে হচ্ছে, ফলে দাম ৬৭-৭০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাবে।’
‘পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুতের বর্ধিত দাম ব্যাংকঋণের সুদের ঊর্ধ্বমুখী হার, সব মিলিয়ে ছোট ফিড মিলগুলোও টিকতে না পেরে উৎপাদন কমাচ্ছে বা বন্ধ করে দিচ্ছে’, বলেন তিনি।
বিশ্বজিতের মতে, মাছের খাবার ও উৎপাদন উপকরণের বাজার নিয়ে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কিন্তু ফিডের, মাছের জন্য ব্যবহৃত অন্য বিভিন্ন উপকরণের মান, ভেজাল এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও পর্যাপ্ত নজরদারি নেই, এটিই তার আক্ষেপ।
মাছ না কিনে রাবেয়ারা সবজির দোকানে গেলেও নাম শুনে দীর্ঘশ্বাস বের হয়।
শিমের কেজি ২০০ টাকা, সবচেয়ে সস্তা পেঁপের দাম, ৩০ টাকা। সাধারণ সবজি কিনতে হলে কেজিপ্রতি অন্তত ৭০ থেকে ১২০ টাকা গুনতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারে আসা ক্রেতা খালিদ ইবনে মিজান বলেন, ‘সব কিছুর দাম বেশি। ১০০ টাকায় বেগুন আর ৮০ টাকায় করলা কিনতে হচ্ছে।’
চালের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী কারওয়ান বাজারের লাকসাম ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী মো. মোশাররফ হোসেন জানান, পরিবহন ব্যয়ের কারণে সরু ও মাঝারি চাল বস্তাপ্রতি ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে।
মেরুল বাড্ডা, বনশ্রী ও মালিবাগ বাজারে সব ধরনের চালের খুচরা দামও কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে। দাম বেড়েছে খোলা ও প্যাকেট জাতীয়-দুই ধরনের আটা-ময়দারও।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির হিসাব বলছে, এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ, সরু চালের ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে। প্যাকেটের আটা ৮ শতাংশ, প্যাকেট ময়দা ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, খোলা আটা ২ শতাংশ এবং খোলা ময়দা ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
ভোজ্যতেল, ডালের দামও বাড়তি। নিউমার্কেটের এক সরবরাহকারী আবরার গফুরের দাবি, পরিবহন ব্যয় বাড়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি। ডিমের বাজার বহুদিন ধরেই অস্থির। ফার্মের বাদামি ডিমের হালি এখন ৫৫ টাকা, এক ডজন ১৫৫। তেজগাঁওয়ের ডিমের পাইকারদের দাবি, দাম যখন কমার কথা ছিল, তখনই ফিড ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় দাম উল্টো বেড়েছে।


