কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপফেক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিনিয়োগের নামে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে। রাতারাতি বড় লাভের প্রলোভন দেখিয়ে অননুমোদিত প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে বিশ্বজুড়ে শুরু হচ্ছে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬।
তবে বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ আয়োজন নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পেছনে পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অনিয়মের বিচার না হওয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি, ভালো কোম্পানির সংকট, প্রতারণার শিকার হয়ে প্রতিকার না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণের কথা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের শিক্ষিত করার আগে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগ শিক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। বাজারে অনিয়ম রেখে শুধু বিনিয়োগ শিক্ষায় জোর দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
বিশ্বের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জোট ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনস (আইওএসসিও) আয়োজিত এবারের বিনিয়োগকারী সপ্তাহে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স, ডিজিটাল ডেসেপশন ও স্ক্যাম অ্যালার্ট।
বাংলাদেশে ৫ থেকে ১১ অক্টোবর বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ পালিত হবে। কর্মসূচির উদ্বোধন হবে ৪ অক্টোবর। সমাপনী অনুষ্ঠান ১২ অক্টোবর। বাংলাদেশে এবার এ আয়োজনের দশম সংস্করণ।
এবারের কর্মসূচিতে ডিজিটাল প্রতারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চেহারা ও কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়া বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অননুমোদিত অ্যাপ ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
আইওএসসিওর তথ্য অনুযায়ী, সম্পর্কের সূত্র ধরে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করাও প্রতারণার একটি বড় কৌশল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডেটিং অ্যাপ বা অনলাইন গ্রুপে পরিচয়ের পর বন্ধুত্ব তৈরি করে ক্রিপ্টোকারেন্সি, স্বর্ণ বা বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট অ্যাপে বিনিয়োগের পর বড় মুনাফা দেখানো হলেও অর্থ উত্তোলনের সময় নানা অজুহাতে তা আটকে দেওয়া হয়। পরে দেখা যায়, পুরো বিনিয়োগ ব্যবস্থাটিই ছিল ভুয়া।
বাংলাদেশের কর্মসূচিতেও এ ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হবে। পঞ্জি স্কিম, অননুমোদিত ফরেক্স ট্রেডিং, ভুয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ও গুজবের ভিত্তিতে বিনিয়োগ না করার বিষয়ে সচেতন করা হবে। বিএসইসির অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্মে অর্থ না রাখা এবং প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত অভিযোগ জানানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘এবারের বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহে বিনিয়োগের বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রতারণা ও অননুমোদিত প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে সতর্ক করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন বিনিয়োগকারী যাতে গুজব বা অযাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজের ঝুঁকি বিবেচনা করে তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে বিনিয়োগ শিক্ষা ও আর্থিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে একটি দায়িত্বশীল ও সচেতন বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী তৈরি করতে কাজ করছে কমিশন।’
প্রতিবছর বিনিয়োগকারী সপ্তাহ পালিত হলেও এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। মগবাজারের বাসিন্দা ও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী সানী মাহমুদ বলেন, ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ নিয়ে আসলে আমাদের আগ্রহ নেই। কারণ, বাংলাদেশে সভা-সেমিনারে কথার ফুলঝুরি থাকে, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর করা হয় না। এসব আয়োজন যদি শুধু সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সহজভাবে পৌঁছায়, তাহলে বিনিয়োগকারী ও বাজার উভয়ই উপকৃত হবে।’
সচেতনতামূলক আয়োজনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অনুষদের ডিন ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ‘সভা-সেমিনারে অনেক আলোচনা হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রভাব না থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এসব আয়োজনে আগ্রহ হারান।’
তার মতে, শুধু বৈশ্বিক মানদণ্ডের আর্থিক শিক্ষার কথা বললে হবে না। স্থানীয় বাজারে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ‘ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি ইমপ্রুভ করলে একটি জ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী তৈরি হবে। তখন বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তব প্রভাবও পড়বে।’
তার মতে, মানুষকে বিশ্বাস করাতে শুধু কথা বলার চেয়ে কত দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন করা যায়, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহে বিএসইসি ছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সিডিবিএল, সিসিবিএল, বিএসএম, বিআইসিএমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠন অংশ নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ বৈচিত্র্য, বাজারের স্বচ্ছতা ও প্রতারণা প্রতিরোধ নিয়ে বিভিন্ন দিনে আলোচনা হবে।
বিশ্বজুড়ে ২০১৭ সালে আইওএসসিও বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ চালু করে। বিনিয়োগ শিক্ষা ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশও ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর এ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এ লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অধ্যাপক আল-আমিনের ভাষায়, এবারের কর্মসূচির উদ্দেশ্য গতিশীলতা বাড়ানো। এখন দেখার বিষয়, সেই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের আচরণ ও বাজারে কতটা প্রভাব ফেলে।


