শহরের কোনো সড়কে পিচের অস্তিত্ব নেই, কোথাও আবার বড় বড় গর্তে জমে আছে বৃষ্টির পানি। কোথাও ইটের খোয়া উঠে মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। তার ওপর সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ফলে নওগাঁ শহরের একাংশের বাসিন্দাদের কাছে স্বাভাবিক যাতায়াতও এখন প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ।
ভাঙাচোরা সড়কের কারণে অটোরিকশা, সিএনজি ও রিকশাচালকেরাও এমন সড়কপথে যেতে অনীহা দেখান। অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েও অনেক সময় যানবাহন পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে রোগী, গর্ভবতী নারী, শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের। খানাখন্দে পড়ে যানবাহনের যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।
সম্প্রতি নওগাঁ শহরের তাজের মোড়, কালীতলা, পালপাড়া, সুলতানপাড়া, গোস্তহাটির মোড়, উকিলপাড়া, চকবাড়িয়া ও দয়ালের মোড়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েকটি সড়কের বিটুমিন উঠে গেছে বহু বছর আগে। পরে ইটের খোয়াও ক্ষয়ে গিয়ে কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত, কোথাও আস্তরণ উঠে গিয়ে মাটির সড়ক দেখা যাচ্ছে। বর্ষায় সেই গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কোনটি কতটা গভীর, তা বোঝার উপায় থাকে না। ফলে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে এবং অনেক স্থানে যানজটও তৈরি হয়।

সড়কের এই বেহাল অবস্থার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জরুরি চলাচলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও অনেক চালক ভাঙা সড়কে যেতে চান না। গর্ভবতী নারীকে নিয়ে এসব পথে চলাচলের সময়ও বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের খানাখন্দে পড়ে রিকশা, অটোরিকশা ও সিএনজির চাকা, সাসপেনশনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। এতে একদিকে চালকদের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রীদের কাছ থেকেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
কালিতলা এলাকার বাসিন্দা সুশান্ত কুমার বলেন, ‘বর্ষায় সমস্যা আরও বেড়ে যায়। কয়েকটি রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু বৃষ্টির সময় চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক জায়গায় পানি জমে।
কাঁচাবাজার এলাকার রিকশাচালক জামাল হোসেন বলেন, গর্তে পানি জমলে কোনটা কত গভীর বোঝা যায় না। রিকশা চালাতে গিয়ে চাকা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। যাত্রী নিয়েও ঝুঁকি থাকে।
শহরের সড়কের দুরবস্থার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। বৃষ্টির দিনে কাদা ও পানি পেরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে বাড়তি সময় লাগছে। কোথাও যানবাহন সংকট, কোথাও সড়কে জমে থাকা পানির কারণে পোশাক ও জুতা নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
শহরের প্রশিকা বিদ্যানিকেতনের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হোসেন আলী বলে, বৃষ্টি হলে স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। রাস্তায় পানি ও কাদা জমে থাকে। অনেক সময় জুতা-কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। গাড়িও সহজে পাওয়া যায় না।
সিও অফিস এলাকার স্কুলশিক্ষিকা খাইরুন নাহার খুশি বলেন, শহরের সড়ক ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা দেবাশীষ সরকার বলেন, তাজের মোড়, কালিতলা, পালপাড়া, সুলতানপাড়া, গোস্তহাটির মোড় ও উকিলপাড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কের অবস্থাই খারাপ। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে। ড্রেনেজ ও সড়কবাতির ব্যবস্থাতেও উন্নতি দরকার।

শুধু ভাঙা সড়ক নয়, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে না পারায় সড়কের ওপর জমে থাকছে পানি। কোথাও ড্রেনে বর্জ্য জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় দুর্গন্ধের পাশাপাশি মশা-মাছির উপদ্রবও বাড়ছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।
২০২৬ সালের জুলাইয়েও ভারী বৃষ্টিতে নওগাঁ শহরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় পৌর প্রশাসক টি.এম.এ. মমিন বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শহরের রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ চলছে এবং পর্যায়ক্রমে পুরো শহরকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ রয়েছে।নাগরিকদের অভিযোগ, ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় রাতের চলাচলেও সমস্যায় পড়তে হয়।
নাগরিক দুর্ভোগের মধ্যেই ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে নওগাঁ পৌরসভায় হোল্ডিং ট্যাক্স ও পানি বিল বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে গত বছর থেকেই পৌরবাসীর একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশ ও সমাজকর্মী নাইস পারভীন বলেন, কর দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকরা সড়ক, ড্রেনেজ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আলোকসজ্জার ভালো সেবা চান। সেবার মান দৃশ্যমানভাবে বাড়লে নাগরিকদের আস্থাও বাড়বে।
তবে পৌর প্রশাসক টি.এম.এ. মমিন বলেন, পৌরকর পুনর্নির্ধারণ নিয়মের অংশ। তার ভাষ্য, পৌর আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর কর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই হোল্ডিং ট্যাক্স ও পানির বিল পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কর নিয়ে আপত্তি থাকলে মূল্যায়ন কমিটির কাছে আবেদন করে পুনর্বিবেচনার সুযোগও রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নওগাঁ পৌরসভার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৩ সালের ৭ ডিসেম্বর। ১৯৮০ সালের ১ মে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ১৯৮৯ সালের ১৩ মে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। সরকারি জেলা তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভাটিতে নয়টি ওয়ার্ড রয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৬৩ বছর পেরিয়ে গেলেও নগরবাসীর ঘুরেফিরে অভিযোগ একই বিষয়গুলো নিয়ে। আর সেগুলো হলো– সড়ক, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আলোকসজ্জা।
অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অবকাঠামোর উন্নয়নকাজও হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নওগাঁ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিজিবি ক্যাম্প-বটতলী থেকে ইকরতারা বাইপাস ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার উন্নয়ন করা সড়ক যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একাধিক প্রকল্প চলমান থাকার তথ্যও রয়েছে। সেখানে বিটুমিনাস সড়ক ১২০ কিলোমিটার, সিসি ও আরসিসি সড়ক ৪৫ কিলোমিটার এবং সোলিং সড়ক ১৪২ দশমিক ৮৮ কিলোমিটারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
নওগাঁ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পৌর এলাকায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা, তিন ধরনের সড়কই রয়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, এসব সড়কের বড় একটি অংশ সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
পৌর প্রশাসক টি.এম.এ. মমিন বলেন, শহরের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে। এরই মধ্যে ১১টি সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য সড়কগুলোরও সংস্কার করা হবে।


