সরকারের বারবার কড়া হুঁশিয়ারি, পুলিশের অভিযান আর হাজার হাজার অপরাধীর তালিকা করার পরও থামছে না চাঁদাবাজি, জমি দখল ও ছিনতাই। ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই পরিস্থিতি লেগেই আছে। ব্যবসাই শুধু নয়, আবাসন প্রকল্প, এমনকি মাছচাষি ও মহিষের খামারিরাও বাদ যাচ্ছেন না। ব্যবসা চালানো, জমি কেনা বা বাড়ি বানানোর কারণে দাবি করছে মোটা অঙ্কের টাকা; প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে সন্ত্রাসীরা।
এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারীদের তালিকা ধরে যৌথ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। কিন্তু অপরাধ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি গাজীপুরে সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা বিকাশ এজেন্টের কর্মচারীদের ওপর গুলি চালিয়ে ৩ কোটি টাকা ছিনিয়ে নেয়। অন্যদিকে, খুলনায় ছিনতাইকারীদের কোপে মারাত্মক আহত হয়েছেন পুলিশের এক পরিদর্শক। এর পরপরই জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে রাতে পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তা ছাড়া মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক এবং ক্যান্টনমেন্ট থানার ইসিবি চত্বরে একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও জমি দখলের ব্যাপারে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যারা চাঁদাবাজিতে মদদ দিচ্ছে এবং যেসব পুলিশ সদস্য এর সঙ্গে জড়িত, তাদেরও আলাদা তালিকা করা হচ্ছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরও একই ধরনের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ টাইমসকে জানান, পুলিশ, এসআরবি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে সন্দেহভাজন অপরাধীদের তালিকা তৈরি করেছে। যাচাই-বাছাই করে প্রতিনিয়ত এই তালিকায় যেমন নতুন নাম যোগ হচ্ছে, তেমনি অনেকের নাম বাদও যাচ্ছে। চাঁদাবাজ, মাদক কারবারী ও ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করে আলাদা অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশের তালিকায় হাজার হাজার অপরাধী
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে ৩ হাজার ৫৮৬ জন চাঁদাবাজ, ২ হাজার ২৫৮ জন সন্ত্রাসী এবং ৫৩৪ জন ছিনতাইকারীর তালিকা রয়েছে। শুধু নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেই রয়েছে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের প্রায় ৩০ শতাংশ।
গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে ৪৬৭টি ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে বাস্তবে ভুক্তভোগীর সংখ্যা এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি বলে ধারণা করা হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে ১ হাজার ২৮০ জন সক্রিয় চাঁদাবাজকে শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৪৮ জন সশস্ত্র ও পেশাদার অপরাধী। এদের অনেকে গ্রেপ্তার হলেও অনেকে ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করে পালিয়ে বেড়ায়। তাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি কামরুম মুনিরা টাইমসকে জানান, অপরাধ ঠেকাতে সারা দেশে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া অপরাধীদের ধরতে সাদা পোশাকে নজরদারি চলছে।
তবে এত তালিকা ও অভিযানের পরও কেন অপরাধ কমছে না–তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নূরুল হুদা টাইমসকে বলেন, অভিযানের তথ্য আগেই বাইরে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা সুযোগ বুঝে পালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক আশ্রয় ও কিছু অভ্যন্তরীণ বাধার কারণেও তারা পার পেয়ে যায়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, শুধু তালিকা করে অপরাধ থামানো যাবে না। অপরাধ কেন কমছে না তার আসল কারণ খুঁজতে হবে, অভিযানের কৌশল বদলাতে হবে এবং স্থানীয়দের এই প্রতিরোধে যুক্ত করতে হবে।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানান, নতুন সরকার আসার পর পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এসব অপরাধ রাতারাতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, কিছুটা সময় লাগবে।
চাঁদার দাবিতে বন্ধ নির্মাণকাজ
উত্তরার রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের বাসিন্দারা বেআইনি দখল, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন। সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, তারা শান্তিতে বসবাস করতে চান এবং এই চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি চান।
মিরপুরের রূপনগরে চার কাঠার একটি জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু বারবার চাঁদার দাবির মুখে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। জমির একজন মালিক মোদাচ্ছের হোসেন টাইমসকে জানান, চার মাস আগে কাজ শুরু করতেই একটি চক্র দফায় দফায় ৫ লাখ টাকা দাবি করে। অগত্যা চাপ সামলাতে না পেরে তিনি কাজ বন্ধ করে দেন।
একইভাবে বর্ধিত রূপনগরে ১০ তলা ভবন করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন ড্যাফোডিল হোমস-এর চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান। চার তলা পর্যন্ত কাজ করার পর ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। থানায় মামলা করলেও কাজের ক্ষেত্রে কোনো নিরাপত্তা পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাড়িমালিক কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার জানান, ওই এলাকায় প্রায় ৫০টি ভবন থেকে একইভাবে চাঁদা চাওয়া হয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর কেরানীগঞ্জের আরশীনগরে ‘অফসানা হাউজিং’-এর অফিসে একদল সশস্ত্র যুবক হামলা চালায়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা এসি, টিভি ও সোফাসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র পিকআপে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানান, ৪০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় প্রায় ১ কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়। এ ঘটনায় ১৬ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
চাঁদাবাজির আঁচ লেগেছে কৃষি খাতেও। জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে মাছচাষি হাসান আলীর কাছে ৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় সংঘর্ষে ১৩ জন আহত হন। এ সময় মাছের গাড়িতেও হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে, পটুয়াখালীর বাউফলে সরকারি খাস জমিতে মহিষ চরানোর জন্য খামারিদের কাছ থেকে পশুপ্রতি মাসে ২০০ টাকা করে চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এক সাবেক ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে মাসে ৪৭৮টি মহিষ থেকে প্রায় ৯৫ হাজার ৬০০ টাকা তোলা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সশস্ত্র ছিনতাই থামছেই না
গাজীপুরের শ্রীপুরে ১০-১২টি মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারীরা একটি বিকাশ এজেন্টের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ ঘটনায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাসহ তিনজন আহত হন, ছিনতাইকারীরা ৩ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
খুলনায় রিকশায় যাওয়ার সময় এক পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলা চালিয়ে টাকা ও ফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর অবস্থায় তাকে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফরিদপুর-রাজবাড়ী সড়কে একটি কাভার্ডভ্যান থামিয়ে চালককে মারধর করে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া সাভারের হেমায়েতপুরে র্যাব পরিচয়ে ২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, যে ঘটনায় পরে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।


