‘মানুষেরও যে আকাশের মতো হৃদয় থাকতে পারে, তাকে না দেখলে হয়তো আমার জানাই হতো না। রূপকথারও বাইরে যে এক বিশাল জগৎ আছে, তার কাছে না শুনলে বোধ হয় শোনাই হতো না…।’
শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষকের প্রভাব কতটা নিবিড় তাই উঠে এসেছে এখানে। শিক্ষাগুরুকে নিয়ে গীতিকবি জুলফিকার রাসেলের লেখা এবং দেশের পপ সংগীতের রকস্টার মাহফুজ আনাম জেমসের গাওয়া একটি বিখ্যাত গান এটি। শৈশবে স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণ মাখা শিক্ষকের প্রতি নৈবেদ্য প্রকাশের অনন্য অনুভূতি উঠে এসেছে এখানে, বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে এখনো ভিন্ন মাত্রা এনে এই গানটি যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য মিথক্রিয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের প্রসঙ্গ এলেই ‘ইতিহাস’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস, তার আরেকজন শিষ্য বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো, প্লেটোর শিষ্য জগদ্বিখ্যাত এরিস্টটল এবং তার শিষ্য বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডারের কথা। ভালো শিক্ষকের দীক্ষা ছোঁয়ায় যে দক্ষ শিক্ষার্থী গড়ে ওঠে তারই এক অনন্য নজির এটি। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশেও সম্রাট আওরঙ্গজেব তার সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের যে মর্যাদার আসন দিয়েছিলেন, তার প্রতিফলনও উঠে এসেছে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা ‘শিক্ষা গুরুর মর্যাদা’ কবিতায়।
কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশের পরিস্থিতি এখন ঠিক উল্টো যেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের আন্তরিকতায় ছেদ পড়েছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কটা বন্দি হয়ে পড়েছে শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মাঝখানে। ক্ষয়ে গেছে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, আর্থিকভাবে দৈন্য জীবন তাদের পরিণত করেছে সমাজের অবহেলিত প্রান্তিক গোষ্ঠীতে। কিন্তু কেন হলো এমন?
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ক্ষমতার চাটুকারিতা করে এবং নিজেদের লোভ-লালসা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সামনে ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়াও অপ্রতুল বেতন-ভাতা কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ফলে নিজেদের নৈতিকতার অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রের অবহেলা–সব মিলিয়ে শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন কোণঠাসা। এরপরও প্রতিবছর শিক্ষক দিবস এলে দেশজুড়ে স্মরণ করা হয় শিক্ষকদের। বছরের একটি দিন শিক্ষকদের স্মৃতিচারণ করেন শিক্ষার্থীরা। সরকারের পক্ষ থেকেও শিক্ষকদের ভাগ্য বদলের আশার বাণী শোনানো হয়। কিন্তু দিবসটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন শিক্ষকদের গুরুত্বও শেষ হয়ে যায়।
তারপরও এই দিনটি এখনো আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশা দেখায়। এবার ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষা, এর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’ প্রতিপাদ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালন করা হচ্ছে। এই স্লোগানটিতেই যেমন শিক্ষকদের বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের বাস্তবতা উঠে এসেছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে তাদের মর্যাদা পুনঃস্থাপনের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মূলত ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ সম্মেলনে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য একটি ঐতিহাসিক যৌথ সুপারিশমালা নেওয়া হয়। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। এবার শিক্ষকদের অধিকার রক্ষার এই উদ্যোগ ছয় দশকে পা দিয়েছে। একইসঙ্গে ১৯৯৫ সাল থেকে এবার নিয়ে ৩৩তম শিক্ষক দিবস পালন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।
এই দিবসটি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি রিয়াজ পারভেজ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দেশের শিক্ষার মেরুদণ্ড। দেশজুড়ে প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক কোটির বেশি শিশু লেখাপড়া করে। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ছাড়া আর কোনো স্থায়ী কর্মচারী নেই। বাথরুম পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পরিষ্কার করার কাজও অনেক স্কুলে শিক্ষকদেরই করতে হয়। বিষয়টি দুঃখজনক।’
গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী শিক্ষক জানান, নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন ফুট-ফরমায়েসের কাজও শিক্ষকদের করতে হয়। এতে একদিকে যেমন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতি মনোযোগ কমে যায়, অন্যদিকে শিক্ষকদের বিভিন্ন অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ বেড়ে যায়। ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং শিক্ষকদের সম্মানহানি হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) গবেষণা প্রতিবেদনেও শিক্ষকদের এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এ বছরের শুরুতে প্রকাশিত এক সরকারি প্রতিবেদনে বরা হয়, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ছাড়াও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশা বহির্ভূত প্রায় ৩৭ ধরনের কাজ করতে হয়।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইজ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩ শতাংশই বেসরকারি। যেখানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাত্র ৭০০-এর কম, সেখানে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রায় ২০ হাজার। বেসরকারি খাতে মাধ্যমিকেও শিক্ষার্থী ৮০ লাখের বেশি। এসব বিদ্যালয়ের লাখো শিক্ষক খুবই স্বল্প বেতনে চাকরি করে যাচ্ছেন। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতনও পান না শিক্ষকরা। এজন্য পরিবার চালাতে অন্য বিকল্প পেশাতেও যুক্ত থাকতে হচ্ছে তাদের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল বাশার হাওলাদার টাইমসকে বলেন, ‘সারা দেশের ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় দুই কোটির মতো শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে। লাখ শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া কয়েক হাজার নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকের সংখ্যা অন্তত তিন-চার। তাদের অবস্থা আরও খারাপ।’
‘দেশের উন্নয়ন চাইলে আগে শিক্ষকের উন্নয়ন করতে হবে। শিক্ষকদের অবহেলা করে কখনো শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব না,’ যোগ করেন তিনি। পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষক ঠিক হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে শিক্ষকদের যেভাবে দেখা হয়, সেই লেন্সটা বদলাতে হবে। চাকরির তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি বা গ্রেড দিয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা যাবে না। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল এবং সর্বোস্তরের শিক্ষক নিয়োগের জন্য পিএসসির আদলে একটি শিক্ষক নিয়োগ কমিশন তৈরি করা জরুরি। এমনকি শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় গতানুগতিক ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের মধ্যে না রেখে শিক্ষক হিসেবে তাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। যারা শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহী, তাদের জন্য শিক্ষকতায় আসার উৎসাহ দেওয়া এবং তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা। অন্য চাকরি না পেয়ে যারা শিক্ষকতায় আসেন, তাদের সঙ্গে একজন শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহী ব্যক্তির শিক্ষকতায় আসার অনেক পার্থক্য আছে। এ ছাড়াও শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে শিক্ষকদের কারও কাছে গিয়ে ধরনা দিতে না হয়।’


