ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে বেড়ে যাওয়ায় সংকট কমাতে মজুত থেকে ডিজেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে বিশ্বের ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলো। শুক্রবার এ বিষয়ে একমত হয়েছে গ্রুপ অব সেভেন (জি৭) জোটের দেশগুলো। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও কানাডা তাদের কৌশলগত মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল ছাড়বে। এই পরিমাণ বিশ্বের এক দিনের তেলের চাহিদার প্রায় সমান। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এই কার্যক্রম সমন্বয় করবে।
জি৭ বলেছে, জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এবং হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে এটি ‘দৃঢ় ও সমন্বিত পদক্ষেপ’। জোটের দেশগুলো আগামী ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল মজুত থেকে ছাড়বে বলেও জানিয়েছে।
তবে মোট ১০ কোটি ব্যারেলের কতটা ডিজেল এবং কতটা অপরিশোধিত তেল, তা জানানো হয়নি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, বিশ্বের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ ডিজেল ও এ ধরনের জ্বালানি। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় সামরিক হামলায় অনেক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেলকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানিতে পরিণত করার সক্ষমতাও কমেছে।
এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। মার্কিন তেল কোম্পানি ও ইউরোপের নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৬ ডলার ৫০ সেন্টে উঠে গেছে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দাম কমানোর উপায় খুঁজতে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ওপর চাপ বাড়ছে।
জি৭-এর সিদ্ধান্তের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘ইউরোপ তাদের বিপুল পরিমাণ মজুত করা ডিজেল তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে।’
জি৭-এর বর্তমান সভাপতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নেতাদের নিয়ে ভিডিও বৈঠক করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।
ওয়াশিংটনের জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ারভিউ শুক্রবার এক নোটে বলেছে, ‘জি৭-এর বাইরের দেশগুলোর ক্ষেত্রে রপ্তানি সীমাবদ্ধতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এখন সেই সম্ভাবনা কম বলে মনে হচ্ছে।’
ম্যাক্রোঁ বলেন, জরুরি মজুত থেকে তেল ও ডিজেল ছাড়ার ফলে পেট্রল ও জ্বালানির দাম ‘যত দ্রুত সম্ভব’ পাম্পে কমে আসবে বলে তিনি আশা করছেন।
শুক্রবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে সরবরাহের জন্য ডিজেলের দাম ৮ শতাংশ কমেছে। সাধারণত গ্রাহকদের দেওয়া খুচরা দামও কমে, তবে তা কিছুটা দেরিতে প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি বন্ধ হলে ইউরোপে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর রুশ জ্বালানি আমদানি বন্ধ করায় ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল।
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাবে, ইউরোপ প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল আমদানি করে। এর এক-তৃতীয়াংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
ওয়াশিংটনের গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনালি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় ইউরোপ তাদের মজুত ছাড়তে খুবই অনিচ্ছুক ছিল। তারা নিজেদের হাতে থাকা সরবরাহ ধরে রাখতে চায়।’
ডিজেলের আরেক বড় সরবরাহকারী চীনও সম্প্রতি আবার জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প একই পথে হাঁটেননি। সময় যত যাবে, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম কমাতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও তত কমবে। একই সঙ্গে এমন পদক্ষেপে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি যানবাহনে পেট্রল ব্যবহার করা হয়।


