শেষ পর্যন্ত ফ্লাই দুবাইয়ের বিমান বাঁচালেন যারা

শেষ পর্যন্ত ফ্লাই দুবাইয়ের বিমান বাঁচালেন যারা
সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে ফ্লাই দুবাইয়ের সেই বিমান। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

ফ্লাই দুবাইয়ের ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজটি বিধ্বস্তের চেষ্টায় কো-পাইলট যখন পাইলটের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছিলেন সে সময় ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে ত্রাতা হয়ে আসেন বিমানে থাকা অন্য দুই পাইলট। তারাই হঠাৎ সুযোগ পেয়ে ককপিটে গিয়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সেটিকে স্থিতিশীল করে সৌদি আরবে জরুরি ও নিরাপদ অবতরণে সক্ষম হন। তবে কারা ছিলেন সেই রহস্যময় দুই পাইলট, ঘটনার তিন দিন পরও তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।

প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের দেওয়া তথ্যমতে ওই দুই পাইলটও ইউনিফর্ম পরা ছিলেন। শনিবার পর্যন্ত তাদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসেনি। ফ্লাইদুবাই শুধু জানিয়েছে, তারা দায়িত্বে থাকা ক্রু সদস্য, যারা যাত্রী হিসেবে ওই উড়োজাহাজে ভ্রমণ করছিলেন। কেন বিমান সংস্থাটি তাদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানায়নি, তাও স্পষ্ট নয়।

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ইসরায়েলগামী ওই উড়োজাহাজে ১৮২ জন আরোহী ছিলেন। পাইলট ছিলেন ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাছছার ও কো-পাইলট হিসেবে ছিলেন ওমানের নাগরিক হামাম আল হাম্মামি। ধারণা করা হচ্ছে উগ্রপন্থার অনুসারী হামাম বিমানটি অজ্ঞাত জায়গায় বিধ্বস্তের চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি টের পেয়ে পাইলট স্মিত ককপিটে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার্য সরঞ্জাম কুড়াল সদৃশ বস্তু দিয়ে হামামকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এসময় ককপিটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। সে সময় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা বিমানটি তীব্র গতিতে ১৭ হাজার ফুট বিপজ্জনক উচ্চতায় নেমে আসে।

আহত পাইলট ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

একপর্যায়ে হামাম ওই ধারালো বস্তু দিয়ে স্মিতকে গুরুতর আহত করলেও তিনি কোনোভাবে ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ভেতরে ঢুকে স্মিতের ওপর থেকে হামামকে সরিয়ে দিয়ে ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নেন বিমানে যাত্রী হিসেবে থাকা দুই পাইলট। প্রায় একই সময়ে বিমানের ক্রুরা যাত্রীদের সহায়তায় হামামকে পরাস্ত করে হেফাজতে নেন এবং জরুরি অবতরণের আগ পর্যন্ত স্মিতের প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করেন।

উড়োজাহাজের সামনের দিকে বসা যাত্রী ড্যানিয়েল শ্লিখটার বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঘটনার সময় ওই দুই পাইলটের ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়া ওই দুই ব্যক্তির বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণগুলোর একটি।

শ্লিখটার জানান তিনি উড়োজাহাজের দ্বিতীয় সারিতে বসেছিলেন। বলেন, ‘এটি অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি। প্রতিটি ফ্লাইটে তো দুজন অতিরিক্ত পাইলট থাকেন না। এই ফ্লাইটে তারা ছিলেন। শুনেছি তেল আবিব থেকে উড়োজাহাজটি আবার দুবাইয়ে ফিরিয়ে আনার সময় তারাই চালকের আসনে থাকার কথা ছিল। এটিই তাদের বিমানে থাকার একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য কারণ বলে মনে হচ্ছে।’

বিমান চলাচলের ভাষায়, এভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো পাইলট বা ক্রুকে যাত্রী হিসেবে অন্য গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাকে ক্রু পরিবহন বলা হয়।

আরও পড়ুন

ককপিটে কী ঘটছে তার ধারণা পাওয়ার পরই ওই দুই পাইলট দ্রুত এগিয়ে যান। যাত্রীরা জানান, কো-পাইলট বারবার ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা চালাচ্ছিলেন এবং চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে ছিল।

এরপর একজন যাত্রী কো-পাইলটকে ধরে ককপিট থেকে টেনে বের করেন। অন্য যাত্রীরা তাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ধস্তাধস্তি শুরু করেন।

শ্লিখটার বলেন, ওই সময় যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করা দুই পাইলটের একজন প্রায় ধস্তাধস্তিতে জড়িত লোকজনের ওপর দিয়ে লাফিয়ে ককপিটে প্রবেশ করেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর অন্য পাইলটও তার সঙ্গে যোগ দেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা ককপিটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন, কারণ তারা চাননি আর কেউ সেখানে প্রবেশ করে বিপর্যয় বাড়াক।

নিরাপদে ইসরায়েলে ফেরার পর বিমানবন্দরে উচ্ছ্বসিত যাত্রীরা। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

অন্য যাত্রীদের মতো শ্লিখটারও প্রথম দিকে নিশ্চিত ছিলেন না, ওই দুই পাইলট ঠিক কোথা থেকে এসেছিলেন। তবে প্রথম যে পাইলট ককপিটে ঢুকেছিলেন, তিনি অত্যন্ত দ্রুত পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন বলে জানান শ্লিখটার। বলেন, ‘তিনি সত্যিই একজন বীরের মতো কাজ করেছেন। উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন এবং এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, যেন ঠিক কী ঘটছে তা তিনি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন।’

‘আমি মনে করি, ওই ফ্লাইটে অন্য যেসব বীর ছিলেন, তাদের মতোই সেই পাইলটের কাছেও আমরা আমাদের জীবনের জন্য ঋণী’, যোগ করেন তিনি।

দুই পাইলট ককপিটে ঢুকে দরজা বন্ধ করার পর ভেতরে কে কী দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তা শ্লিখটার জানতে পারেননি।

উড়োজাহাজটি এতটাই তীব্রভাবে নিচে নেমে গিয়েছিল যে এর দিকনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি অংশ ছিঁড়ে যায়। এরপর উড়োজাহাজটিকে স্থিতিশীল করতে ১০ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগে। ওই সময় এটিসির (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) কাছে জরুরি বিপদসংকেত পাঠানো হয়। দুই পাইলট দ্রুত উড়োজাহাজটি অবতরণের জন্য একটি নিরাপদ স্থান খুঁজতে থাকেন।

এদিকে আতঙ্কিত যাত্রীদের মধ্যে ওই দুই পাইলটকে নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। তারা কারা এবং তাদের আদৌ বিশ্বাস করা যাবে কি না, তা নিয়ে কয়েকজন যাত্রী চিন্তিত হয়ে পড়েন।

শ্লিখটার বলেন, ‘উড়োজাহাজটি স্থিতিশীল করার পর আসলে তারা আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। বলতেই হবে, এতে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। ভাবছিলাম, ওই দুই ব্যক্তি হয়তো উড়োজাহাজটি ছিনতাই করে ইরান বা অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন। কারণ আমরা আসলে গন্তব্য থেকে খুব বেশি দূরে ছিলাম না।’

তবে প্রায় ৪৫ মিনিট পর ওই পাইলটরা ঘোষণা করেন, তারা সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ করবেন এবং সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

সেই ঘোষণা শোনার পর দুই পাইলটের ওপর আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নেন ড্যানিয়েল শ্লিখটার। শেষ পর্যন্ত তার সেই আস্থাই সঠিক প্রমাণিত হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad