ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি ‘হেইট ক্রাইম’ বা ঘৃণামূলক অপরাধ ও বৈষম্যের ঘটনাগুলো সুশৃঙ্খলভাবে নথিভুক্ত করতে একটি ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ও পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমানদের লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে।
সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের সহিংসতা ও হেনস্তার প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটনার সঙ্গেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিজেপি কর্মী-সমর্থক অথবা সমমনা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা জড়িত। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার যখন সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের জন্য প্রশাসনের কাছে যায়, তখন অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চরম উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা বা ভুক্তভোগীদের প্রতি বৈরী আচরণ প্রদর্শন করে।
ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের সাংবিধানিক অধিকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নথিভুক্ত করার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই এই তথ্যভাণ্ডারটি তৈরি করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য প্রতিটি ঘটনার বিশদ তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা; যার মধ্যে রয়েছে সঠিক তারিখ ও স্থান, অপরাধের পেছনের কথিত উদ্দেশ্য, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের পরিচয় এবং এফআইআরের অগ্রগতিসহ পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপ। পরিশেষে, এই তথ্যগুলোকে একটি উন্মুক্ত, অনুসন্ধানযোগ্য এবং বিশ্লেষণমূলক তথ্যভান্ডারে রূপান্তর করা হবে, যা সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং আইনি পেশাজীবীদের জন্য ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রামাণ্য দলিল এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারবে।
তথ্য সংকলনের কাজে যুক্ত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কেবল চলতি বছরের আগস্ট মাসেই ভারতজুড়ে অন্তত ৫৪টি ঘৃণামূলক অপরাধ ও সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে জনবহুল রাস্তা—নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর ধরন ও ভৌগোলিক অবস্থান ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়।
মহারাষ্ট্রে পুনের কাছে নানঘাট ঐতিহাসিক জলপ্রপাত দেখতে যাওয়া একটি পরিবার বৈরী আচরণের শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে। নারী ও শিশুদের উপস্থিতিতে একদল হিন্দুত্ববাদী সমর্থক মহারানা প্রতাপের বীরত্বগাথা নিয়ে ১৯৪০-এর দশকে লেখা ‘হলদিঘাটি’ কবিতার যুদ্ধ-সম্পর্কিত পঙ্ক্তিগুলো উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে শুরু করে।
অভিযোগ উঠেছে, মুসলিম পরিবারের মধ্যে মানসিক আতঙ্ক ও ভয় সৃষ্টি করার জন্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনবহুল স্থানে ঐতিহাসিক এই কবিতাটি ব্যবহার করা হয়েছিল। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বয়ানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সামাজিক মেরুকরণের একটি উদাহরণ হিসেবে ঘটনাটিকে তুলে ধরা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনায় বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের করা মন্তব্যের জেরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের মাদ্রাসাগুলো কার্যত ‘জিহাদি উৎপাদনের কারখানা’ এবং এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের মারাত্মক অভাব রয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু মাদ্রাসায় শিশুদের নির্যাতন ও অমুসলিমদের প্রতি শত্রুতা প্রচার করা হচ্ছে এবং মাদ্রাসা ব্যবস্থার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও মৌলিক সংস্কারের দাবি জানান তিনি। তার এই মন্তব্য সমাজের বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশানা করে সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।
উত্তরাখণ্ডে কানওয়ার যাত্রার সময় এক বাকবিতণ্ডা থেকে গুরুতর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে বলে খবর পাওয়া গেছে। আকবরপুর ঢারকির একটি পরিবারের মালিকানাধীন একটি গাড়ি ঘিরে ধরে ভাঙচুর চালায় একদল লোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি উন্মত্ত জনতা গাড়িটির জানালা ভেঙে ফেলছে এবং ভেতরে থাকা নারী ও শিশুদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও ভিড় থামানোর জন্য তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে আহত নারী ও শিশুদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছে।
সহিংসতার এসব সাম্প্রতিক ঘটনার পাশাপাশি, সংখ্যালঘুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ও আইনি হয়রানির একটি চিত্রও এই তথ্যভাণ্ডারে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটনা সম্পর্কিত লখনৌয়ের একটি বিশেষ এনআইএ আদালতের সাম্প্রতিক একটি যুগান্তকারী রায়।
১৯৯৩ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে গোরক্ষপুরের ইসমাইলপুরে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়া, কালো পতাকা ওড়ানো এবং ‘আরেকটি পাকিস্তান’ তৈরির উসকানি দেওয়ার অভিযোগে মোহাম্মদ নাঈমকে দেশদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৩৩ বছর আইনি লড়াইয়ের পর আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে ৭৮ বছর বয়সী নাঈমকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।
জীবনের একটি বড় অংশ ‘দেশদ্রোহী’ তকমা নিয়ে কাটানোর পর, বার্ধক্যে এসে খালাস পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন নাঈম। দীর্ঘসূত্রীতাপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হয়রানির কারণ হতে পারে, এই মামলাটিকে তার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, আগস্ট মাসে নথিভুক্ত ৫৪টি ঘটনার প্রতিটি সমর্থন করার জন্য নির্ভরযোগ্য মিডিয়ার লিংক, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ডিজিটাল ভিডিও প্রমাণ এবং প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এফআইআর সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর ঘৃণামূলক আচরণ এবং শারীরিক হামলার যে মাত্রা ও প্রকৃতি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা জনসমক্ষে আনা এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় বৃহত্তর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।


