কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল চৌধুরী তার ও এক পরিচিত ব্যক্তির একই নামে থাকা প্রত্যয়নপত্র সংশোধন করতে প্রায় এক মাস ধরে ঘুরছেন। তারা জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাসিন্দাদের না চেনার কারণে সামান্য কাজ করতে গিয়েও এমন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ওয়ার্ডটির সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক বাবুর মতে, আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এ ধরনের প্রত্যয়নপত্র এক দিনেই সরবরাহ করতেন।
একই চিত্র রাজশাহীর কেশরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হরিদাগাছি গ্রামে। বাবার ট্রেড লাইসেন্সের জন্য প্রায় দেড় মাস ধরে পৌরসভায় যোগাযোগ করছেন রায়হান আলী। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।
জনপ্রতিনিধি না থাকায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকারের সেবা পেতে নাগরিকদের দুর্ভোগ চরমে উঠলেও নির্বাচনে এখন পর্যন্ত আগ্রহ দেখাচ্ছে না বিএনপি সরকার, যা তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকারের বিরোধী।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ ভেঙে দেয়। ইউনিয়ন পরিষদগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে না দিলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বা দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিতদের প্রায় ৮০ শতাংশই পলাতক। এ কারণে সব প্রতিষ্ঠানেই প্রশাসক বা অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক হিসেবে বিএনপি দলীয় লোক দেওয়া হলেও পৌরসভাগুলোতে সরকারি কর্মকর্তারা প্রশাসক হয়েছেন। এ ছাড়া কাউন্সিলর বা কমিশনারের দায়িত্বও পালন করছেন বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
কিশোরগঞ্জের সংবাদকর্মী সাইফউদ্দীন আহমেদ লেনিন টাইমসকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যেভাবে একজন জনপ্রতিনিধির কাছে যেতে পারে, প্রশাসকের কাছে সেভাবে যেতে পারে না। প্রশাসক বা ওয়ার্ডের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা বাসিন্দাদের চেনেন না। ফলে তারা যে কাজে আসেন, সেটি করতেও অনেক ঝামেলা হয়।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান বদিউল আলম মজুমদার টাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচন দীর্ঘায়িত হলে জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে।’
স্থবির উন্নয়ন, এক দিনের কাজ ১০ দিনে
স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও এখন স্থবির হয়ে আছে। রাস্তা মেরামত, ড্রেনের উন্নয়ন, ট্রেড লাইসেন্স, বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার জন্য নতুন আবেদন কিংবা ওয়ারিশ সনদ–সব কিছুতেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা। যে কাজ আগে এক দিনে হয়ে যেত, সেগুলো এখন ১০ থেকে ১২ দিন, ক্ষেত্রবিশেষে এক মাস লেগে যাচ্ছে।
বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কয়েকজন ওয়ার্ড সচিব জানান, আগে কাউন্সিলররা প্রয়োজনীয় সনদে আগে থেকেই স্বাক্ষর করে রাখতেন। সচিবরা কাগজপত্র যাচাই করে সনদ দিয়ে দিতেন। কিন্তু বর্তমানে ওয়ার্ড সচিবরা যাচাই করে আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠালে সেখানে আবার পরীক্ষা করা হয় এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তার স্বাক্ষরের পর সনদ মেলে। একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে ৭ থেকে ১০টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়ায় ফাইলের স্তূপ জমছে এবং সময় অনেক বেশি লাগছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘জনদুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে পৌরসভা পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।’
সচেতন নাগরিক কমিটি-সনাক এর কুমিল্লা শাখার সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, ‘গ্রাম থেকে নগর—সর্বত্রই জনভোগান্তি চরমে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, জনভোগান্তিও তত বাড়বে।’
গত ২৩ সেপ্টেম্বর বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ে জন্মনিবন্ধন করাতে আসা নিয়াজ মোর্শেদ জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ পর তার নিবন্ধন শেষ হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সুলতান মিয়া বলেন, ‘যেসব ইউনিয়নে এখনো জনপ্রতিনিধি দায়িত্বে আছেন, সেখানে এক দিনেই জন্ম নিবন্ধনের সেবা পাওয়া যায়।’
তবে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক জেবুন নাহার শাম্মী টাইমসকে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিরা যেভাবে সহজে সেবা দিতে পারেন, একজন কর্মকর্তার পক্ষে তা দেওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন।’
জামালপুর শহরের দড়িপাড়া এলাকার শাওন মোল্লা নাগরিক সনদের জন্য গিয়েছিলেন পৌরসভা কার্যালয়ে। যে কাজের জন্য আগে এক-দুই ঘণ্টাই যথেষ্ট ছিল, সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও শাওনকে পরদিন আসতে বলা হয়।
জামালপুরের ৬৮টি ইউনিয়নের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক। স্থানীয়রা বলছেন, গ্রাম এলাকায় বিরোধ নিষ্পত্তি ও সালিশের যে কাজগুলো জনপ্রতিনিধিরা করতেন, সরকারি কর্মকর্তারা তা করেন না। ফলে সামান্য বিরোধের নিষ্পত্তিতেও এখন মামলা, মারামারি, সংঘাত ও হামলার ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা জানান, ডিশলাইনের তার কেটে নেওয়ার মতো নিত্যদিনের সমস্যায় আগে কাউন্সিলরের কাছে সমাধান মিললেও এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না।
অতিরিক্ত দায়িত্বে বিপাকে প্রশাসকরাও
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক নায়েমা আক্তার জানান, নিজস্ব দাপ্তরিক দায়িত্বের পাশাপাশি আরও দুটি জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিয়মিত ওয়ার্ড কার্যালয়ে বসা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, ‘চাইলেও নির্বাচিত কাউন্সিলরের মতো কাজ করা সম্ভব নয়।’
দুর্গাপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোতালেব আলী জানান, পৌর প্রশাসক মাসিক সভা ছাড়া কার্যালয়ে আসেন না। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজু বলেন, ‘নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই কাজ করতে হবে।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক রেফায়েতুল হায়দার জানান, স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায়িত্ব সামলে ওয়ার্ড কার্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না; সচিব অফিসে ফাইল আনলে তিনি স্বাক্ষর করে দেন।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুই-তিনটি ওয়ার্ডের কাজের সঙ্গে দাপ্তরিক কাজ সামলানো কঠিন। কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারছি না, আবার মানুষের ভোগান্তি দেখেও সমাধান করতে পারছি না।’
সিলেট সিটি করপোরেশনে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর ১৪ জন কর্মকর্তাকে ৪২টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তুহিন আহমদ অভিযোগ করেন, কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে ফোনে পাওয়া যায় না এবং দেখা করাও কঠিন। ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহমুদ খান জানান, একটা কাগজের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ধরনা দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মানুষ দালাল ধরছে।
জামালপুরের একটি পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বলেন, ‘কর্মকর্তারা তো একটি নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে আসেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের সেবা রাতেও পাওয়া যেত, প্রয়োজনে বাসায় গিয়েও সই নিয়ে আসা যেত।’
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল—তৃণমূলের জনগণের ইচ্ছায় দেশ চলবে এবং পদশূন্য না হলে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। তারা ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ৭ জুলাই ঘোষণা দেন অক্টোবর থেকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হবে। তবে গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে নির্বাচনের ঘোষণা দিলে সরকার তা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, নির্বাচন কমিশন তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। পরবর্তীতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রংপুরের এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আগামী জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ৬ জুনের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন শেষ হবে।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এভাবে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে থাকলে একদিকে জনগণকে ভুগতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪ হাজার ৭০০টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (১৩টি সিটি করপোরেশন, ৪৯৫টি উপজেলা, ৩৩০টি পৌরসভা, ৩ হাজার ৮০০টির বেশি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৬১টি জেলা পরিষদ) নির্বাচন আয়োজনের আইনগত এখতিয়ার তাদের রয়েছে। আইন অনুযায়ী কোনো পরিষদ ভেঙে দেওয়ার পর ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, কিশোরগঞ্জ ও জামালপুর প্রতিনিধি)


