নব্বইয়ের দশকে রাম জন্মভূমি আন্দোলনকে ঘিরে চরম উত্তেজনা ও সহিংসতার মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কয়েক দশক পর ভারতে ভিন্ন আঙ্গিকে একই ধরনের বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও বুলডোজার প্রয়োগের মাধ্যমে মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
ভারতের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয় সুরক্ষার স্পষ্ট আইনি নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবে সেসব সুরক্ষা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের একটি অংশ ভেঙে ফেলার ঘটনা দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মসজিদটি রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উজ্জয়িনীর ওই শাহী মসজিদে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ও ব্যারিকেড নিশ্চিত করে টানা চার দিন ধরে ভাঙার কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন দাবি করেছে, আগামী ২০২৮ সালের কুম্ভ মেলাকে সামনে রেখে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সড়ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মসজিদের নির্দিষ্ট একটি অংশ অপসারণের বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও মসজিদ কমিটির মধ্যে একটি পূর্ব সমঝোতা হয়েছিল। তবে স্থানীয় সাধারণ মুসলিম অধিবাসীরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। উপাসনালয়টি রক্ষায় তারা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মসজিদ চত্বরে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু গত সোমবার প্রশাসনের তরফ থেকে মসজিদের বাইরে প্রসারিত ছাদের অংশ ভেঙে ফেলার পর বুলডোজার সরাসরি মিনারের দিকে এগিয়ে যায়।
সমঝোতা অনুযায়ী, মসজিদের নির্দিষ্ট স্থানটুকু ভাঙার কথা থাকলেও মিনার গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় ঐতিহ্যবাহী মসজিদের গম্বুজ ও প্রথম তলার একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে প্রশাসন ঘটনাটিকে নিছক একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের দাবি, উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানোর সময় ব্যবহৃত যন্ত্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এই ক্ষতি হয়েছে।
অবশ্য স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় প্রশাসনের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অভিযোগ, অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে অনভিজ্ঞভাবে কাজ করার কারণেই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক সমঝোতা মেনে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেরাই নির্ধারিত অংশ ভাঙার কাজ করছিলেন এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ওপরমহলের চাপের কথা উল্লেখ করে প্রশাসন একতরফাভাবে যন্ত্র ও বুলডোজার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনাকাঙ্ক্ষিত এই ক্ষতির নেপথ্যে সেটিই প্রধান কারণ। এমনকি কয়েকজন বাসিন্দার আশঙ্কা, ভাঙার এই পুরো ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে, ঐতিহাসিক মসজিদটির সুরক্ষাবেষ্টনী ভাঙার খবর শুনে সাবেক মসজিদ কমিটি সভাপতি আরশাদ রহমানি তীব্র মানসিক আঘাতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা গুজব না ছড়াতে সর্বসাধারণের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রোশন কুমার সিং জানিয়েছেন, এলাকাটির উন্নয়নকাজ শান্তিপূর্ণভাবে চলছে এবং সেখানে সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত রয়েছেন। কেউ অপপ্রচার বা গুজব ছড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
নিরাপত্তার স্বার্থে শাহী মসজিদ চত্বরের ৫০০ মিটারের মধ্যে যেকোনো ধরনের ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারী সশস্ত্র পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির কারণে পুরো এলাকায় এখনো থমথমে ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত শত বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভেঙে ফেলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। মসজিদটি রানওয়ে এলাকা থেকে কিছুটা দূরত্বে অবস্থিত। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযানের সপক্ষে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখাচ্ছে।
বিষয়টি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টে বিচার প্রক্রিয়ার অধীন রয়েছে এবং আগামী ৭ অক্টোবর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা এই অবকাঠামো থেকে আগে কখনো নিরাপত্তাজনিত কোনো সংকট তৈরি না হলেও হঠাৎ কেন এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
পশ্চিমবঙ্গের সচেতন মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বারবার কেন মসজিদকেই লক্ষ্যবস্তু করা ও বিতর্কের মুখে ফেলা হচ্ছে, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।


