অপ্রতিমকে আমরা এভাবে চিনতে চাইনি

অপ্রতিমকে আমরা এভাবে চিনতে চাইনি
Oprotim - AI Collage By TIMES
Advertisement
Advertisement

কয়েক দিন আগেই আমার ছেলের বয়স তেরো বছর পূর্ণ হয়েছে। তাই শনিবার সকালে তেরো বছর বয়সী অপ্রতিমের ছবিটি যখন প্রথম দেখি, তাকে কোনো সংবাদের চরিত্র হিসেবে দেখিনি। দেখেছি আমার নিজের ছেলের বয়সী এক কিশোরকে। এমন একটি শিশুকে, যে বাইরে গিয়েছিল, ফিরতে একটু দেরি হচ্ছিল, আর যেকোনো মুহূর্তে হয়তো দরজায় কড়া নেড়ে ঘরে ফিরে আসবে।

তেরো বছর বয়সে কোনো শিশুই আর খুব ছোট থাকে না, আবার পুরোপুরি বড়ও হয়ে ওঠে না। তার নিজের কিছু বন্ধুবান্ধব তৈরি হয়, গড়ে ওঠে আলাদা এক জগৎ, আর ভেতরে জন্ম নেয় স্বাধীনতার নতুন এক অনুভূতি। সে কখনো সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, কখনো ফিরতে একটু বেশি দেরি করে ফেলে। আমরা যারা এই বয়সটা পার করে এসেছি, তারা জানি তখন জীবন কত দ্রুত বদলাতে শুরু করে। বন্ধুদের গুরুত্ব বাড়ে, বাবা-মায়ের সঙ্গে মতের অমিল নিত্যদিনের বিষয় হয়ে ওঠে, নিজের ইচ্ছাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। একজন বাবা হিসেবে আমার চাওয়া খুব সাধারণ। আমার ছেলে বড় হোক, পৃথিবীটাকে জানুক, নিজের মতো করে একটি জগৎ গড়ে তুলুক, আর দিন শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসুক। অপ্রতিমের জন্যও আমি ঠিক এটাই চেয়েছিলাম।

শনিবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে তার মা নাহিদা নাহিদ ফেসবুকে লিখেছিলেন, “বেলা ৩টা থেকে আমার ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছি না।” তাঁর আকুল আবেদন ছিল, “হাতজোড় করে বলছি, আপনারা যে যেভাবে পারেন আমার ছেলেকে বাঁচান।” হাজার হাজার মানুষ পোস্টটি শেয়ার করেছিলেন, তার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। সবার চাওয়া ছিল একটাই। আমরা চেয়েছিলাম অপ্রতিম বাড়ি ফিরে আসুক।

কিন্তু সে আর ফেরেনি।

শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। সঙ্গে থাকা আইফোনটি পাওয়া যায়নি। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যের সম্ভাবনাও দেখছে এবং তদন্তের অংশ হিসেবে একজনকে আটক করেছে। মৃত্যুর আগে অপ্রতিমের শেষ মুহূর্তের দৃশ্য সংবলিত সিসিটিভি ফুটেজও অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে তাকে কেন হত্যা করা হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং ঠিক কী ঘটেছিল, তা কেবল সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মরদেহের ছবিও ঘুরতে শুরু করেছিল। অনেকেই হয়তো তা দেখেছেন। এগুলো দেখার মতো দৃশ্য নয়, তবু মানুষ দেখে। হয়তো নিজের চোখে সেই ভয়াবহতার সত্যতা যাচাই করে নিতে চায়। কিন্তু এর পেছনে আরেকটি বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। রক্তাক্ত একটি শিশুর ছবি যদি আমাদের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা আর দশটি সাধারণ ছবির মতোই গা-সওয়া হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে আমাদের সামগ্রিক সংবেদনশীলতায় গভীর কোনো অসুখ বাসা বেঁধেছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর শোনার পর আমি ‘মুন অ্যালার্ট’ (MUN Alert) পেজে গিয়েছিলাম। সেখানে বেশিক্ষণ চোখ রাখা যায় না। একের পর এক হারিয়ে যাওয়া শিশুর মুখ। আবার তাদের মধ্যেই কিছু শিশুর পাশে সুখবর, তাকে পাওয়া গেছে, সে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এই শেষটাই তো আমরা দেখতে চাই। শিশু ফিরে আসবে বাবা-মায়ের বুকে, আর একটি পরিবারে ফিরে আসবে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

আরও পড়ুন

তবে পরিসংখ্যান আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সারা দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫,৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এর মানে হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুকে খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু তখনো বাড়ি ফেরেনি। সংখ্যার হিসাবে ২,০৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়ে গেছে। এটিকে কেবল শুকনো পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা অসম্ভব। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ফোনের পাশে বসে থাকা কোনো মায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এক থানা থেকে অন্য থানায় ঘুরে বেড়ানো কোনো বাবার আহাজারি, আর শূন্য পড়ে থাকা একটি বিছানা।

তবে শিশু নিখোঁজ মানেই অপহরণ বা অপরাধ, এমন সরল ব্যাখ্যা সঠিক নয়। পুলিশের তথ্য বলছে, নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় সামান্য অভিমান বা তর্কাতর্কি, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, ইন্টারনেটের প্রভাব, অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক কিংবা স্রেফ স্বাধীনভাবে চলার ইচ্ছায়ও বাড়ি ছাড়ে। তুলনামূলক ছোট শিশুরা আবার ভিড়ের মধ্যে পরিবারের কাছ থেকে দলছুট হয়ে পড়তে পারে এবং কোথায় তাদের বাড়ি, তা ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতেও পারে না। এর অর্থ হলো, সমাধান কেবল পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারগুলোকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্তানরা কোনো ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারে। স্কুলগুলোতে ডিজিটাল নিরাপত্তা শেখানো জরুরি। বাবা-মায়েদেরও বুঝতে হবে যে কৈশোর কেবল শাসন করার সময় নয়; এটি শোনার, বিশ্বাস অর্জনের এবং জীবনের ঝুঁকিগুলো বুঝিয়ে বলারও সময়।

ঠিক এই জায়গাতেই ‘মুন অ্যালার্ট’-এর মতো উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর পাঁচ বছর বয়সী শিশু মুনতাহা আক্তার জারিনের মরদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই ব্যবস্থাটি চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট: নিখোঁজ শিশুর তথ্য যাচাই হওয়া মাত্রই তা যেন দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ১৩২১৯ হটলাইন, একটি ওয়েব পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো এই উদ্যোগেরই অংশ। কিন্তু এই উদ্যোগকে আরও বড় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ করতে হবে। একটি শিশু হারানোর পর তার মায়ের ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হলো কি না, কোন অ্যালগরিদম সেটি কার সামনে দেখাল, তার ওপর শিশুটির উদ্ধার নির্ভর করতে পারে না। নির্দিষ্ট এলাকার মোবাইল ফোনে জরুরি বার্তা পাঠানো, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, টোল প্লাজা ও গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে দ্রুত ছবি প্রচার, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এবং পুলিশ, ডিবি, পিবিআই ও সিআইডির মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়, এসবকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম খবরটিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা। পরিবার তখন জানে না শিশুটি বন্ধুর বাসায় আছে, অভিমান করে কোথাও বসে আছে, নাকি সত্যিই বিপদে পড়েছে। তাই শুরুতেই অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বয়স, শেষ অবস্থান, ফোনের লোকেশন, কার সঙ্গে বের হয়েছিল, সাম্প্রতিক যোগাযোগ, এসব দ্রুত যাচাই করে ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণ ডায়েরি, বিভিন্ন সংস্থার আলাদা তথ্য এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। একটি শিশু হারিয়ে গেলে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারণাটিকে শুধু পুলিশের নয়, রাষ্ট্রের নীতি করতে হবে। মুন অ্যালার্টকে আরও শক্তিশালী, স্বয়ংক্রিয় এবং দেশব্যাপী ব্যবস্থায় পরিণত করা দরকার।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতারও পরীক্ষা দরকার। অপ্রতিমের মা যখন সন্তান খুঁজতে ব্যস্ত, তখনও তাকে লিখতে হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের জন্য যেন কেউ ফোন না করেন। আমরা বিপদ দেখলে কখনো সাহায্য করি, আবার কখনো কৌতূহলী দর্শকে পরিণত হই। নিখোঁজ শিশুর পরিবারের নম্বরে অকারণে ফোন করা, যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো, মরদেহের ছবি শেয়ার করা, এসবের কোনোটি সহমর্মিতা নয়। একইভাবে পরিবারেও সন্তানদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি, যেখানে তারা ভয়, অভিমান, অনলাইন সম্পর্ক বা কোনো অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে। নিরাপদ পরিবার, নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ রাস্তা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়া রাষ্ট্র, সবকিছু একসঙ্গে প্রয়োজন।

অপ্রতিমের মৃত্যুর সঠিক কারণ আমরা জানতে চাই। যদি একটি আইফোনের জন্য তাকে খুন করা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত বীভৎস। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকলে সেই সত্যও উন্মোচিত হওয়া জরুরি। দায়ীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। কিন্তু বিচার আসে মৃত্যুর পরে। এই মুহূর্তে আমাদের বড় কাজ হলো, আরেকটি শিশুর ক্ষেত্রে যেন গল্পটি মর্মান্তিকতায় গিয়ে শেষ না হয়। কোনো শিশু হারালে পরিবার যেন একা না থাকে, একটি মায়ের আর্তি যেন শুধু ফেসবুক পোস্ট হয়ে না থাকে, পুরো রাষ্ট্র যেন সঙ্গে সঙ্গে সেই শিশুটিকে খুঁজতে নামে।

অপ্রতিমকে আমরা এভাবে চিনতে চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম তার হাসিমুখের ছবির নিচে লেখা থাকুক, “পাওয়া গেছে, সে বাড়ি ফিরেছে।” মুন অ্যালার্টে প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া শিশুর পাশে আমরা সেই বাক্যটিই দেখতে চাই। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ঘর থেকে বেরিয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরুক, কোনো ‘উদ্ধারকৃত মরদেহ’ হিসেবে নয়।

 

লেখকঃ আবু শাহেদ ইমন (চলচ্চিত্র নির্মাতা)

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad