রাতারাতি বড় কোনো পরিবর্তনের প্রত্যাশা না করে, শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির ভিত্তি স্থাপন করা হচ্ছে কি না তার ভিত্তিতেই সরকারকে বিচার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে বেসরকারি বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন শিক্ষাক্রম ও সরকারি তদারকির আওতায় আনা হবে।
শনিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে ‘সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম সংলাপ: সরকার কতদূর এগিয়েছে? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংলাপে শিক্ষাবিদ, গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকেরা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সংকট, শিক্ষাক্রম সংস্কার, বাজেট বাস্তবায়ন এবং কাঠামোগত বৈষম্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
‘ভুল ধরিয়ে দিয়ে জবাবদিহির আওতায় আনুন’
বক্তব্যের শুরুতেই প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই আপনারা আমাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনুন। আমরা চেষ্টা করব, ভুলও করব, এবং আপনাদের উচিত আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষক ঘাটতির কথা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী জানান, সেখানে শিক্ষক নিয়োগ সরাসরি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে না হয়ে জেলা পরিষদের মাধ্যমে হয়। এই সমস্যা সমাধানে পার্বত্য অঞ্চলের পরিষদ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ চলছে।
প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি) বিদ্যমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দুই দশক আগে যখন এটি শুরু হয়েছিল তখন এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন অবকাঠামো, শিক্ষার মানোন্নয়ন, আইসিটি সবকিছু এক ছাতার নিচে আনায় ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভবন নির্মাণ আর শিক্ষার্থীর শিখন মান উন্নত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ।
এক শিফটের স্কুলের দিকে যাওয়ার সরকারি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশব্যাপী এটি চালুর মতো অবকাঠামো এখনো নেই। তবে এক ও দুই শিফটের সময়ের পার্থক্য খতিয়ে দেখতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) সংস্কার এবং শিশু মনোবিজ্ঞানী ও প্রারম্ভিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পাঠ্যক্রম সংস্কারের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কেবলই স্লোগান
সংলাপে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়তে হলে আগে মানসম্মত শিক্ষার বাংলাদেশ গড়তে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে শ্রমজীবী মানুষের উত্থান, ইনসাফ ও নতুন বন্দোবস্তের কথা কেবল স্লোগানই থেকে যাবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তিনটি বড় সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিলেও পাস করতে পারছে না; দ্বিতীয়ত, অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও শিক্ষার্থী মিলছে না এবং তৃতীয়ত, সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চাইছেন না। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার চেয়ে বড় অন্যায় আর কিছু হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ২০০ দিন পার হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, বন্যা ও কোভিডের মতো ধাক্কায় শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ধরা পড়েছে। বর্তমান শিক্ষা খাতের মূল সংকট হলো বিভিন্ন ধারার মধ্যকার বিভাজন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নবনিযুক্ত নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, জিপিএ-৫ নির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের বিতর্ক ও খেলাধুলার মতো বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করাতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলেমেয়ের সমতা নিশ্চিত হলেও ধনী ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সুযোগের মধ্যে এখনো বড় ফারাক রয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও তার যথাযথ ব্যবহারের তাগিদ দেয় সিপিডি।
শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষার দাবি
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিভাবকদের শিক্ষা ব্যয়ের ২৭ শতাংশ যায় প্রাইভেট টিউশনে এবং ১৯ শতাংশ টিউশন ফিতে। সমাধান একটাই—শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি কওমি মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেনসহ সব শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত শিক্ষা আইনের আওতায় আনার দাবি জানান এবং স্কুল কমিটিতে যেন কোনো দলীয় রাজনীতির ব্যক্তি না থাকে, সেই আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন চান। তবে মিড-ডে মিল মনিটরিংয়ে মায়েদের সম্পৃক্ত করাকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
উশৃঙ্খল মব নয়, সচেতন নাগরিক চাই
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান বলেন, ‘সবার জন্য এক শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আমরা এমন পাঠ্যবই তৈরি করছি যা সচেতন নাগরিক তৈরি করবে, কোনো উশৃঙ্খল মব তৈরি করবে না।’
তিনি নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী মিড-ডে মিল ও ডে-কেয়ার সেন্টারের ওপর জোর দেন।
সাবেক ইউজিসি সদস্য তানজিমউদ্দিন খান প্রাথমিক শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার অভ্যাসের যে অভাব, তা দূর করতে প্রাথমিক স্কুলেই লাইব্রেরি চর্চা শুরু করতে হবে। পাঠ্যক্রম তৈরিতে রাজনৈতিক কর্মীর বদলে মনোবিজ্ঞানীদের যুক্ত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বা দিনাজপুরের মতো অঞ্চলের জন্য আলাদা পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শূরার সদস্য ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মোল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সংস্কারের দাবি জানান। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রকে ‘সরকারকে খুশি করার’ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মিড-ডে মিল প্রকল্প ভালো হলেও সেখানে যেন কেনাকাটায় কোনো দুর্নীতি না থাকে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ৫০৩টি উপজেলার ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ প্রাথমিক স্কুলেও করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরামর্শ দেন।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের দিয়ে নিজেদের স্কুল পরিষ্কার করানোর মতো সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখানোর ওপর জোর দেন তিনি।
নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) প্রতিনিধি রিয়াদুস সালেহীন জাওয়াদ শিক্ষা বাজেটের অব্যবস্থাপনা দূর করার পাশাপাশি পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো মেগা স্ট্রাকচার এলাকাগুলো থেকে প্রপার্টি ট্যাক্স সংগ্রহ করে তা শিক্ষা খাতে ব্যয়ের অভিনব প্রস্তাব দেন।
সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লা, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এবং চিকিৎসক তাসনিম জারা।


