রাস্তাঘাটে, বাসে, ট্রেনে কিংবা ধরুন ফুটপাথে – যেখানেই থাকুক, থুথু পেলেই বাঙালি ‘ওয়াক থু’ করে দিবে। পান চিবুতে চিবুতে পিচকিরি মেরে দিবে – হোক সেটা সাদা দেয়াল, কুচ পরোয়া নেহি। কিংবা ধরুন মূত্র বিসর্জন করতে হবে – অমনি ফুটপাতে বসে যাবে। আর হাঁচি! আপনি ভাবছেন টিস্যু কিংবা রুমাল নাকে চাপাবে! কাভি নেহি! ভিড়ের মধ্যে, পারলে মানুষের মুখের ওপর দিব্যি ‘হ্যাঁচ্য’ মেরে দিবে।
ফলাফল, ঘরে ঘরে সর্দি-গর্মি লেগেই থাকে; ফুটপাথ মূত্ৰনদীতে সয়লাব – হাঁটার উপায় থাকে না; সুন্দর এস্থেটিক কোনো স্থাপনা দু’দিনেই বিচিত্র মেরুন কালারের আঁকিবুঁকি (পানের পিচকিরির দাগ); ওপেন এয়ার হাঁচি আর কাশিতে শুধু সর্দিই নয়, ভয়ংকর যক্ষাও ছড়ায়! যক্ষায় বিশ্বের শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি দেশের একটি এই আমাদের সোনার বাংলাদেশ। অথচ একটু সচেতন হলে অনেকটাই এড়াতে পারি আমরা।
তো উপায় কি নেই? মানুষকে বোঝাতে হবে, সচেতন করতে হবে। না বুঝতে চাইলে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। ভালো কথা আপনি মানুষকে বোঝাতে গেলে আপনাকে উল্টো বুঝিয়ে দেবে যে সে যা করছে সেটাই ঠিক! সে হয়তো জানেও কিন্তু মানে না। মানাতে গেলে আইন আছে কি না নিশ্চিত হতে হবে আবার আইন থাকলেও তার প্রয়োগ আছে কি না পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এক মহা ঝক্কিঝামেলা। কার খেয়েদেয়ে কাজ নেই তো বনের মোষ তাড়াবে বলুন?
যেমন ধরুন আইনে (ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫) আছে, পাবলিক প্লেসে এবং পাবলিক পরিবহনে ধূমপান করলে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা জরিমানা। এর প্রয়োগের কথা শুনেছেন? হলেও কালেভদ্রে হয়তোবা। যা জনমনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে নাই। আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে থুথু ফেললে জরিমানার বিধান আছে। বাংলাদেশে প্রকাশ্যে রাস্তাঘাটে বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে থুথু ফেললে আইনগতভাবে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স (১৯৭৬)- এর ৮০ ধারা অনুযায়ী, রাস্তায় বা জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কেউ থুথু ছিটালে এবং এতে পথচারী বিরক্ত হলে ২০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট দেওয়ালে বা স্থানে নিষেধ সত্ত্বেও থুথু ফেললে ১০০ টাকা জরিমানার নিয়ম আছে। রাজশাহী মহানগরী পুলিশ আইন-১৯৯২ (৮৩ ও ৮৬ ধারা) এবং চিটাগং মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৭৮ (৮২ ধারা) অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সিলেট ও বরিশাল মহানগরী পুলিশ আইন-২০০৯ অনুযায়ী প্রকাশ্যে থুথু ফেললে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগের কথা কখনো শোনা যায় নাই।
এমনইভাবে প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ, যত্রতত্র আবর্জনা, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ফেলার জন্যও জরিমানার বিধান রয়েছে, মাত্র ২০০ টাকা। সেই একই কথা, কেউ শুনেছে কি না যে এর জরিমানা আদায় করা হয়েছে!
আমাদের দেশে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নাই – এই বাস্তবতা হলেও বিশ্বের অনেক দেশে আছে। সেসব দেশে নির্দিষ্ট আইনের অধীনে প্রকাশ্য স্থানে থুথু ফেললে মোটা অঙ্কের জরিমানা বা শাস্তির বিধান রয়েছে। পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত রাখতে এই কঠোর নিয়মগুলো কার্যকর করা হয়।
যেমন সিঙ্গাপুরে পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর আইন রয়েছে। প্রথমবার জনসমক্ষে বা রাস্তায় থুথু ফেললে সর্বোচ্চ ১ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে জরিমানার পরিমাণ ২ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। দুবাইসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় থুথু ফেলা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দুবাইতে প্রকাশ্য স্থানে বা রাস্তায় থুথু ফেললে সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার দিরহাম পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। লন্ডনসহ যুক্তরাজ্যের অনেক কাউন্সিলে প্রকাশ্য স্থানে থুথু ফেলাকে ‘অসামাজিক আচরণ’ বা পরিবেশ দূষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর জন্য তাৎক্ষণিক ৮০ থেকে ১৫০ পাউন্ড পর্যন্ত অন-দ্য-স্পট জরিমানা বা ফিক্সড পেনাল্টির নোটিশ দেওয়া হতে পারে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (যেমন: মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি) প্রকাশ্য স্থানে, বিশেষ করে থুথু বা পানের পিক ফেলার বিরুদ্ধে কড়া আইন আছে। স্থানভেদে এর জরিমানা ২০০ থেকে ৫ হাজার রূপি পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলবেন, আইনের প্রয়োগের পূর্বে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। জনগণ সচেতন না হলে শুধু আইনের প্রয়োগ ঘটিয়ে এসব বন্ধ করা যায় না। স্বাস্থ্যখাতে এ বছর মোট জিডিপির ১.০১ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হলেও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এর কত টাকা খরচ করা হবে তা সুনির্দিষ্ট নাই। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচি আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন জাতীয় মিশনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কাজ করা হয়। গ্রামীণ ও নগর অঞ্চলের এই মেগা প্রজেক্টের একটি বড় অংশ খরচ হয় জনসচেতনতা তৈরিতে। সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে (যেমন ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছর) ভারতে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো রোগগুলোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ভারতের প্রতিটি স্বাস্থ্য স্কিম বা স্বাস্থ্য কর্মসূচির ভেতরেই ‘আইসি’ বা তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ নামে একটি নির্দিষ্ট সাব-বাজেট থাকে। এই ফান্ড থেকে টিভি, রেডিও, খবরের কাগজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ও ক্যাম্পেইন চালানো হয়।
যুক্তরাজ্যে ইংল্যান্ড জনস্বাস্থ্য বা সমগোত্রীয় বিভাগের মাধ্যমে ধূমপান বর্জন, স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় বিশাল বাজেট বরাদ্দ দেয়। অস্ট্রেলিয়া ও ওটিসি দেশসমূহে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে জীবনযাত্রার মান উন্নত করার প্রচারণা ও স্ক্রিনিংয়ের (যেমন- স্তন ক্যানসার বা কোলন ক্যানসার স্ক্রিনিং সচেতনতা) জন্য বার্ষিক বাজেট আলাদা করে রাখে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন জিডিপির একটি ভালো অংশ জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সচেতনতায় ব্যয় করে।
তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যও আছে। যেমন ধরুন ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে সরকার, আইসিসিডিআরবি’র পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থ্যা ব্র্যাকের ঘরে ঘরে হাতেকলমে ওর স্যালাইন বানানোর পদ্ধতি ব্যাপক পরিসরে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেছে। ৮০’র দশকের রেডিও টেলিভিশনে প্রচারিত প্রোমোগুলোও সচেতনতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলো।
যেখানে সেখানে থুথু ফেলা, মলমূত্র ত্যাগ এবং ধূমপান বন্ধে বাংলাদেশ সরকার আইনগত, অবকাঠামোগত এবং সচেতনতামূলক বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। নিচে সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো আলোচনা করা হলো:
আইন ও কঠোর প্রয়োগ
নির্দিষ্ট আইন তৈরি: যেখানে সেখানে থুথু ফেলা বা কাশির জন্য কঠোর জরিমানার বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।
ধূমপান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন: বিদ্যমান ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জরিমানা বৃদ্ধি করা।
অন-স্পট জরিমানা: ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের তাৎক্ষণিক জরিমানার ব্যবস্থা করা।
বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ (সংশোধিত ২০১৩) থাকলেও যেখানে-সেখানে থুথু ফেলা বা মলমূত্র ত্যাগের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই। সিটি কর্পোরেশনের কিছু উপ-আইন থাকলেও তার জরিমানা অত্যন্ত সামান্য।
প্রয়োগে দুর্বলতা: আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল (যেমন: পরিদর্শক বা পুলিশ) নেই। জনবহুল দেশে প্রতিটি কোণায় নজরদারি করা কঠিন।
প্রমাণের অভাব: অন-স্পট বা তাৎক্ষণিক অপরাধ প্রমাণ করার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা বা ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।
সামাজিক মনস্তত্ত্ব: আইন ভাঙাকে বড় অপরাধ মনে না করার একটি সামাজিক প্রবণতা রয়েছে, যার কারণে আইন প্রয়োগ করতে গেলে প্রায়ই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ মানুষের বাধার মুখে পড়তে হয়।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন
পর্যাপ্ত গণশৌচাগার নির্মাণ: সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোর মাধ্যমে জনবহুল এলাকায় আধুনিক, পরিষ্কার এবং নিরাপদ পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা বাড়ানো।
স্পিটুন ও ডাস্টবিন স্থাপন: রাস্তাঘাট, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে থুথু ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্পিটুন এবং ময়লা ফেলার ডাস্টবিন স্থাপন করা।
ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা: জনসমাগমস্থল থেকে দূরে নির্দিষ্ট কিছু উন্মুক্ত স্থানে ধূমপানের জোন তৈরি করা, যাতে অধূমপায়ীরা পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে বাঁচেন।
প্রযুক্তি ও নজরদারি
সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার: শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত করা।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং: ডাস্টবিন বা পাবলিক টয়লেটের অবস্থান সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য মোবাইল অ্যাপের ব্যবস্থা করা।
ব্যাপক সচেতনতা ও প্রচারণা
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ও শর্ট ফিল্ম প্রচার করা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন: স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা।
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ততা: জুমার খুতবা ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা।
তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি
উচ্চ শুল্ক আরোপ: সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর ট্যাক্স বা কর বাড়িয়ে এগুলোর মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া, যা ধূমপানের হার কমাতে সাহায্য করবে।
এতকিছুর পরেও যদি এসব অপকর্মের সুরাহা না হয়, তাহলে কবিগুরুর মতো আক্ষেপ করে বলতে হবে, “হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি ক’রে, মানুষ কর নি।” যদিও এর মাধ্যমে তিনি বাঙালিকে স্বাধীন ও সাহসী হয়ে ওঠার প্রেরণা জুগিয়েছেন, লড়াই করার সাহস জুগিয়েছেন। আসুন আমরা না হয় যত্রতত্র থুথু, হাঁচি, কাশি, মলমূত্র ত্যাগের বিরুদ্ধে লড়াই করি!
লেখক: ডেপুটি এডিটর, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ


