হত্যা মামলায় ‘অদৃশ্য হাত’, বাদীর অজান্তে আসামি ব্যবসায়ী

হত্যা মামলায় ‘অদৃশ্য হাত’, বাদীর অজান্তে আসামি ব্যবসায়ী
হত্যা মামলায় ব্যবসায়ীর জাকির হোসেনকে আসামি করার অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কক্সবাজারে একটি হত্যা মামলায় বাদীর অজান্তে এক ব্যবসায়ীকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে। একটি চক্র সেই ব্যবসায়ীকে আগে থেকেই হয়রানি করার চেষ্টা করার তথ্যও মিলেছে। পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সেই চক্রের যোগসাজশের তথ্যও মিলেছে।

সেই ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। মামলার বাদী নিজে জিম্মাদার হয়ে জামিন চাইলেও পুলিশের বিরোধিতার পর তার জামিন হয়নি। পরে তিনি পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেছেন।

সেই ব্যবসায়ীর স্ত্রী এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করার পর পুলিশ সদরদপ্তর থেকে এই ঘটনার তদন্ত চেয়ে নির্দেশ এসেছে কক্সবাজারে। পরে মামলার তদন্তের ভার থানা থেকে সরিয়ে গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাত তখন সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার শহরের সিটি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে সমিতি বাজার এলাকার মোহাম্মদ একরাম নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। দুইজন যুবক তাকে গুলি করেন। দুর্বৃত্তদের আরও একজন মোহাম্মদ সোহেল ওরফে রহমত নামের আরেকজনকে গুলি করতে করতে নিয়ে দৌড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় একরামকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। দুই সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে গত ১৪ সেপ্টেম্বর একরামের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ রহমত এখনো বেঁচে আছেন।

একরামের বাবা জালাল আহমদ ২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন। সেই মামলার আসামির তালিকায় পুলিশ জাকির হোসেন নামের শহরের এক ব্যবসায়ীর নাম ঢুকিয়ে দেয়, যেটি জালাল জানতেন না।

জালাল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি জাকিরকে আসামি করিনি, তাকে চিনিও না। বিষয়টি পুলিশ সুপারকে প্রথমে মৌখিক ও পরে লিখিতভাবে জানিয়েছি’।

বাদীর অভিযোগ, তিনি মামলা করতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় গেলে উপপরিদর্শক (এসআই) মিঠুন পালিতসহ কয়েকজন তাকে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যান। সেখানে পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেন, পরিদর্শক (অপারেশন) শুভন ও কম্পিউটার অপারেটর (রাইটার) দারুস সালাম নিজেদের মতো একটি এজাহার তৈরি করেন।

সেই মামলায় সমুদ্রপাড়ের ব্যবসায়ী জাকিরের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পুলিশ কর্মকর্তা অন্য একজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন বলেও জানিয়েছেন বাদী জালাল। মামলার এজাহারে জাকিরের বাবা-মায়ের নাম এবং পূর্ণাঙ্গ ঠিকানাও আছে। অথচ অন্য আসামিদের নাম থাকলেও পিতা-মাতার পরিচয় ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই।

জালাল জানান, যে সময় এজাহার লেখা হচ্ছিল, ওই সময় রাইটার দারুস সালামের পাশে বসা এক পুলিশ কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জাকিরের আইডি কার্ড পাওয়া গেছে? ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ এমন কথা বলতে শুনেছেন বাদীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরাও।

আরও পড়ুন

অভিযোগ আছে, জাকির হোসেনকে বিভিন্ন মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতে চেষ্টা করে আসছিল একটি চক্র। এই চক্রের একজন হিসেবে  সাতকানিয়ার করাইয়াঘোনা এলাকার মুজিব চেয়ারম্যান নামে একজনের নাম আসে। তার সঙ্গে জাকিরের কলাতলী এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। মুজিব চেয়ারম্যান সেই দ্বন্দ্বে জাকির হোসেনকে নানা হুমকিও দিয়েছিলেন।

এজাহারে জাকিরের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর মুজিব চেয়ারম্যান ও তার সহযোগী মোহাম্মদ ফারুক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় থাকা একরামের কাছে যান। ওই সময় তাকে দিয়ে জাকিরের নাম বলিয়ে ভিডিও রেকর্ড করা হয়। পরে এই ভিডিও সংবাদকর্মীদের কাছে কাছে পাঠান ফারুক। তিনি দাবি করেন, একরাম হত্যার হোতা হলেন জাকির।

একরামের ভাই জাবেরকেও ফোন করেন ফারুক। তিনি বলেন, ‘একরামকে সহযোগিতা করতেছি, এগুলো কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। তোমার বাবাকে জাকিরকে জামিন না করার কথা বলো। আমি একরামের অনেক মামলা শেষ করে দিয়েছি, এটাও চালাব এবং আমাদের কথা কাউকে বলো না।’ এই কথোপকথনের অডিও সংরক্ষিত আছে টাইমসের হাতে।

বাদী টাইমসকে বলেছেন, হাসপাতালে থাকার সময় একরামের কাছে একাধিকবার যান মুজিবুর ও ফারুক। জাকিরের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার জন্য তারা তদবির করেন।

যোগাযোগ করা হলে ফারুক তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘যারা অভিযোগ দিয়েছে তাদের কাছে তদন্ত করুন।’

মুজিব চেয়ারম্যানকে কল করা হলে তিনি রাগ দেখিয়ে বলেন, ‘যে মামলায় আমি আসামি নই, সেটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলবেন কেন?’

মামলাটির রেকর্ড করেছেন পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেন। এজাহার লেখার পর বাদী জালাল আহমদ তাতে টিপসই দেন। ওই এজাহারে দাবি করা হয়, গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন জাকির, তিনি আবার নিজেই উপস্থিত থেকে একরামকে ছুরি মারেন।

অথচ বাদী, তার ছেলে জাবের ও বড় ছেলে আবছার বলছেন, তারা নির্দেশ ও হুকুমদাতা হিসেবে আবুল মনছুর ওরফে লুদুর কথা বলেছিলেন। আর যার বিরুদ্ধে গুলি করার অভিযোগ, সেই মুবিনের নাম থাকার কথা ২ নম্বরে।

পরে বাদী জালাল ও নিহত একরামের পুরো পরিবার গত ২০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। এতে থানায় এজাহার পরিবর্তন, আসামি এলোমেলো ও মূল তথ্য বাদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানান, বাদীর অভিযোগ পেয়ে মামলাটি জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে।

জাকিরকে র‌্যাব (বর্তমান এসআরবি) গ্রেপ্তার করার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর বাদী নিজেই ‘জিম্মা ও আপসনামা’ দিয়ে জাকিরের জামিন চান। তবে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মিঠুন পালিত ও রেকর্ডকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেনের বিরোধিতায় তিনি জামিন পাননি।

বাদীর অজান্তে জাকিরকে আসামি করার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেন দাবি করেন, অভিযোগ সত্য নয়। তিনি বলেন, ‘বাদী কাকে আসামি করবেন, কাকে করবেন না–সেটা একান্তই তার এখতিয়ার। সেখানে পুলিশের কোনো কিছু করার নেই।’

জাকিরের পরিবার বিষয়টি নিয়ে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে দেখা করে। পরে জাকিরের স্ত্রী সুমাইয়া নূর উর্মি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। এই অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশ সদরদপ্তর থেকে কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওসি মোহাম্মদ আলী অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, বাদী নিজেই এজাহার দিয়েছেন, সে অনুযায়ী মামলা হয়েছে।  ‘আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। একরামও মৃত্যুর আগে জাকিরের নাম বলে ভিডিও রেকর্ড দিয়ে গেছেন। তারপরও পুলিশের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে’, বলেন তিনি।

পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে প্রশ্ন পাঠালেও জবাব আসেনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad