সবুজ গালিচায় তার বুটজোড়া হয়ত আপাতত স্থির, কিন্তু পর্তুগিজ ফুটবল অঙ্গন যেন এক মুহূর্তের জন্যও থমকে নেই তাকে ছাড়া। ডেনমার্কের বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচের আগে হুট করে শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বাতাসে ভেসে বেড়ানো গুঞ্জন, অভিমান আর নানা প্রশ্ন—সবকিছুর একটাই মূল সুর: পর্তুগাল জাতীয় দলে কি তবে শেষ হয়ে গেল সিআরসেভেনের বর্ণাঢ্য অধ্যায়?
নেশনস লিগে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারানোর পর এই প্রশ্নটিই আবার ঘুরপাক খেল ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে। তবে কোচ ও সতীর্থদের মুখে যে উত্তর মিলল, তাতে বিতর্কের ধোঁয়া ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক ধরনের ভালোবাসা, সম্মান আর প্রত্যাবর্তনের আকুতি।
কোচ জর্জে জেজুসের ভাষায়, রোনালদো চাইলে আবার জাতীয় দলে ফিরতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘পরবর্তী জাতীয় দল ঘোষণার আগে ক্রিস যদি আল-নাসরে খেলে, তাহলে তাকে ডাকা যেতে পারে। সে যদি চায়, অবশ্যই জাতীয় দলে ফিরবে।’
অর্থাৎ সিদ্ধান্তটা এখন অনেকটাই রোনালদোর হাতে। কোচের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে যত আলোচনা, যত গুঞ্জন—সবকিছুর পরও জেজুসের বক্তব্যে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট, রোনালদোর ফেরার সম্ভাবনাকে তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
বরং কোচ জানালেন, পরবর্তী স্কোয়াড ঘোষণার আগেও রোনালদোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সে যদি চায়, আগের স্কোয়াড ঘোষণার সময় যেমন আমরা কথা বলেছিলাম, তেমনি পরবর্তী স্কোয়াড ঘোষণার আগেও আমরা কথা বলতে পারি। কিন্তু সিদ্ধান্তটা ক্রিসই নেবে।’
অধিনায়ককে ভুলে যাননি সতীর্থরা
রোনালদোকে ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেও সতীর্থদের বক্তব্যে যেন অন্যরকম একটা বার্তা। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর জুয়াও কান্সেলো মনে করিয়ে দিলেন—রোনালদো এখনো তাদের অধিনায়ক, এখনো জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
তিনি বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আমাদের অধিনায়ক এবং আমাদের জাতীয় দলের প্রতীক। আমাদের সর্বকালের সেরা তিনি।’
কান্সেলোর কথায় শুধু একজন সতীর্থের প্রতি সমর্থন ছিল না, ছিল রোনালদোর প্রতি পর্তুগালের ফুটবলীয় ঋণের কথাও।
‘পর্তুগালের জন্য কতটা প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এই দেশকে তিনি কী দিয়েছেন, সবাই জানে।’
এরপরই এল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথাটা। কান্সেলো বললেন, তিনি বিশ্বাস করেন শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভালোভাবেই শেষ হবে। তবে সেই সমাধানে রোনালদোর প্রাপ্য সম্মানটুকু থাকা জরুরি।
‘আমরা চাই পরিস্থিতিটি খুব শান্তভাবে এবং ক্রিশ্চিয়ানোর প্রাপ্য সম্মানের মাধ্যমে সমাধান হোক।,’ যোগ করেন তিনি।
রোনালদোর ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে সতীর্থদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন নুনো মেন্দেসও। তার কাছে বিষয়টি যেন খুবই সহজ—জাতীয় দলে ফিরলে রোনালদোকে স্বাগত জানানো হবে।
‘জাতীয় দলে যে কোনো ফুটবলার এলে তাকে অবশ্যই স্বাগত জানানো হয়। ক্রিস ফিরলে আমরা অবশ্যই এখানে তাকে দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করে নেব।’
এই কথাগুলোই হয়ত বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে মানবিক দিকটি সামনে আনে। মাঠের উত্তাপ, কোচের সঙ্গে মতবিরোধ কিংবা ড্রেসিংরুমের অস্বস্তি—সবকিছুর বাইরে রোনালদো এখনো সতীর্থদের কাছে রোনালদোই।
শুরুটা যেভাবে
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আগের ম্যাচে। গা গরম করেও মাঠে নামানো হয়নি রোনালদোকে। সেখান থেকেই কোচ জর্জে জেজুসের সঙ্গে তার টানাপোড়েনের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
পরে পর্তুগিজ ফেডারেশনের সভাপতির উপস্থিতিতে বিষয়টি মিটে যাওয়ার খবরও আসে। মনে হচ্ছিল, পরিস্থিতি হয়ত স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
কিন্তু ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে কোচের কিছু বক্তব্যের পর আচমকাই দৃশ্যপট বদলে যায়। রোনালদো জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, যথাসময়ে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করবেন।
এরপর পর্তুগালের সংবাদমাধ্যমে আসে আরও বিস্ফোরক দাবি—ঘনিষ্ঠ মহলে নাকি রোনালদো বলেছেন, তিনি ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ শিকার হয়েছেন।
জয় আসছে, প্রশ্নও থাকছে
রোনালদোকে ছাড়া পর্তুগাল অবশ্য মাঠে নিজেদের কাজটা ঠিকই করে যাচ্ছে। ডেনমার্ককে ৪-২ গোলে হারানোর পর নরওয়ের বিপক্ষেও এসেছে ২-১ গোলের জয়। নেশনস লিগের এই ধাপে চার ম্যাচে চার জয় নিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালও নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
নরওয়ের বিপক্ষে শুরুতে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরেছিল পর্তুগাল। কান্সেলোর দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরার পর গনসালো রামোসের গোলে জয় নিশ্চিত হয়।
কিন্তু ম্যাচ শেষেও যেন জয়টা পুরোপুরি আলোচনার কেন্দ্র হতে পারল না। কারণ প্রশ্নটা থেকেই গেল—রোনালদো কোথায়?
ব্রুনো ফের্নান্দেসও এর আগে বলেছিলেন, রোনালদোর সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবেই তিনি থাকবেন। এবার কান্সেলো ও নুনো মেন্দেসের কথাতেও একই সুর।
তাহলে কি ফিরছেন রোনালদো?
এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। রোনালদো নিজে এখনো ফেরার ঘোষণা দেননি। আবার কোচ জেজুসও তাকে বাদ দেওয়ার কোনো বার্তা দেননি। বরং তার বক্তব্যে স্পষ্ট—রোনালদো চাইলে ফিরতে পারেন।
আর সতীর্থদের কথায় আরও স্পষ্ট, ফেরার দরজাটা তার জন্য খোলাই আছে।
তাই আপাতত পর্তুগালের সামনে দুটি সমান্তরাল গল্প। একদিকে রোনালদোকে ছাড়াই দুর্দান্ত ছন্দে এগিয়ে চলা একটি দল, অন্যদিকে সেই দলেরই সবচেয়ে বড় প্রতীককে ঘিরে অনিশ্চয়তা।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা হয়ত রোনালদোরই। পর্তুগাল অপেক্ষায়—ক্যাপ্টেন কি আবার ফিরবেন?


