সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের জামিন নামঞ্জুর

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের জামিন নামঞ্জুর
খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছে আদালত। সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) মঞ্জুরুল ইসলাম এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডনের আইনজীবী মো. মফিজুল ইসলাম।

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন জড়িত নয় বলে জামিন আবেদন করেন ডনের আইনজীবী মো. মফিজুল ইসলাম।

জামিন শুনানি শেষে আইনজীবী মফিজুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি সিনেমার প্রয়োজনে সেখানে আশরাফুল হক ডন ভিলেনের চরিত্র করেন। একটি সিনেমাতে যেভাবে নায়কের প্রয়োজন হয় ঠিক একই ভাবে ভিলেনেরও প্রয়োজন হয়। সেই সিনেমার প্রয়োজনেই তিনি ভিলেনের চরিত্র করেছেন কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি একজন ভালো মানুষ। বর্তমানে ডন মিডিয়াট্রায়ালের শিকার হচ্ছেন।’

অন্যদিকে জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন আদালতকে বলেন, ‘ডন এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি এই হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামিও। তাই আমরা তার জামিনের বিরোধিতা করছি।’

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বাদীপক্ষ নারাজি দেওয়ার পর মামলাটি ডিবি তদন্ত করে। পরবর্তীতে বাদীপক্ষ আবারও নারাজি দিলে সিআইডি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। সিআইডির তদন্তেও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এরপর ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আবারও রিভিশন করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুরতহাল প্রতিবেদনে সালমান শাহর দুই কানের নিচে কালো বর্ণের দাগের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ মামলাটি বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংস্থা তদন্ত করেছে। মোট পাঁচবার তদন্তের পরও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।’

জামিন আবেদনে বলা হয়, জামিন আবেদনে ডনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরাপরাধ দাবি করে বলা হয়েছে, তাকে অহেতুক হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কারাগারে আটক থাকা, শারীরিক অসুস্থতা এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তার জামিন চাওয়া হয়েছে।

আবেদনে আরও বলা হয়, ডন মামলার ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তাকে অযথা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলায় জড়ানো হয়েছে। জামিনে মুক্তি পেলে তিনি পালাবেন না এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত জামিনদার প্রদান করবেন। ডনের আইনজীবী আবেদনে মামলার আলামত ও বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ও তুলে ধরেছেন। সেখানে দাবি করা হয়েছে, মামলার দুটি সুরতহাল প্রতিবেদন, দুটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ভিসেরা প্রতিবেদন এবং রাসায়নিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ডনের জামিন চাওয়া হয়েছে।

এর আগে, পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ডনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করার অভিযোগ তোলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রিমান্ডে ডনের আচরণ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে তদন্ত সংস্থাটি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে আদালতে দেওয়া আবেদনে জানায় সিআইডি।

পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গত ৯ সেপ্টেম্বর ডনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আরও পড়ুন

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আশরাফুল হক ডন ছিলেন সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি সালমান শাহর সঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। মামলার এজাহারে থাকা পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ডন তাদের চেনেন বলে স্বীকার করেন। তবে মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি গোপন করছেন বলে দাবি করে সিআইডি।

আবেদনে আরও বলা হয়, এই চিত্রনায়কের মৃত্যু ও মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে ডন অত্যন্ত কৌশলীভাবে উত্তর দেন। তার আচার-আচরণ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।

সিআইডি আরও জানায়, মামলাটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় পাওয়া তথ্যগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে ডনকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।

গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর গত ২০ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ২৭ আগস্ট রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে, গত ২৫ আগস্ট ঢাকার ১১তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নুরুল ইসলামের আদালতে ডনের পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত সেটিও নামঞ্জুর করেন। তারও আগে ১২ আগস্ট সিএমএম আদালতেও তার জামিন আবেদন নাকচ হয়েছিল।

দীর্ঘদিনের রহস্য সালমান শাহর মৃত্যু

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় মারা যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মৃত্যু নিয়ে শুরু থেকেই রহস্য ও নানা প্রশ্ন রয়েছে। ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে–এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

পরবর্তীতে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে নারাজি দিয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করেন এবং তাদের ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহের কথা জানান।

র‌্যাব-পিবিআই হয়ে নতুন করে হত্যা মামলা

পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র‍্যাব (বর্তমানে এসআরবি)। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ র‌্যাবকে তদন্ত বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতি দেন।

পরে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘদিন এর শুনানি হয়নি। এরপর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালত সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর সালমান শাহকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে হত্যা করা হয়েছে–এমন অভিযোগে তার মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলার আসামিরা হলেন–সামিরা হকের মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad