জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে প্রসিকিউশন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ৭ অক্টোবর দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে সরকারের অংশ হিসেবে হানিফ নেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন এবং অধীনস্থদের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে তা বাস্তবায়ন করেছিলেন।
সিভিলিয়ান নেতা হিসেবে অধীনস্থদের নির্দেশনা এবং টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি এসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছেন বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
তামিম বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন নাছিমকে একই অপরাধে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছে। একই অবস্থানে থেকে অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখায় হানিফকেও একই শাস্তি দেওয়া হবে বলে প্রসিকিউশন আশা করছে।
প্রসিকিউটর বলেন, একটি বড় রাজনৈতিক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হানিফ দলীয় সব ধরনের সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনি উসকানি ও সহায়তা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তামিম। ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত থেকে হানিফ সমর্থন জানিয়েছেন বলেও প্রসিকিউশনের দাবি।
তামিমের ভাষ্য, হানিফ টেলিফোনে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার, জেলা ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এসব টেলিফোন কথোপকথন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক নির্দেশনা, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়ায় প্রাণঘাতী হামলাগুলো সংঘটিত হয়। এসব ঘটনা পরিকল্পিত ও সমন্বিত আক্রমণের অংশ ছিল।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আজগর আলী এক বক্তব্যে বলেন, তাদের নেতা হানিফের নির্দেশ রয়েছে আন্দোলন ‘যে কোনোভাবে’ দমন করার। প্রসিকিউশন যুক্তিতর্কের সময় ওই বক্তব্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
প্রসিকিউশনের দাবি, আসামিদের বক্তব্য, নির্দেশনা ও সাংগঠনিক ভূমিকার প্রত্যক্ষ প্রভাবেই কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়।
এর আগে গত ১০ জুন এ মামলায় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে। পরে প্রসিকিউশন অতিরিক্ত প্রমাণাদি দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। চার আসামিই বর্তমানে পলাতক। এ কারণে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়।
হানিফ ছাড়া মামলার অন্য তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।
প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগকে যথেষ্ট বলে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের যে বৈঠকে মন্তব্য করেছিলেন, সেখানে উপস্থিত থেকে ওই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানানো; ২৯ জুলাই কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া এবং এ বিষয়ে ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া; এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে কুষ্টিয়ায় ছয়জন শহীদ ও আরও কয়েকজন আহত হন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়। গত বছরের ৬ অক্টোবর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। একই বছরের ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।


