বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে ৩-০ গোলের জয় আর ১টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে অঝোরে কেঁদেছেন লিওনেল মেসি। ম্যাচের পর মাইক্রোফোন হাতে ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার আবেগ সামলাতে হিমশিম খান। বাবার স্মৃতি, দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময়ের সংগ্রাম, সতীর্থদের লড়াই এবং সমর্থকদের ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
বিদায়ী সংবর্ধনায় আবেগে আপ্লুত মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আজ কী বলব তা বলা কঠিন। অনেক আবেগ কাজ করছে, মাথায় অনেক কিছুই ঘুরছে। অবশ্যই সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে।’
জাতীয় দলের জার্সির প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘গত ২০ বছরের বেশি সময় এই জার্সির প্রতিনিধিত্ব করতে পারা আমার জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়। আমরা যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি এবং আমিও যে কঠিন সময় পার করেছি, সেসবের মধ্যেও কখনো লড়াই থামাইনি। সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, সব সময় এখানে থাকতে চেয়েছি। আর না আসাটা আমার জন্য অনেক বড় কষ্টের হবে। আপনাদের সবাইকে শপথ করে বলছি, সারা জীবন এখানে আসতে চাই। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটতে পারে এমন সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।’
তবে বাস্তবতার তাগিদ অনুভব করে মেসি বলেন, ‘যদিও আমি সারা জীবন এখানে থাকতে চাই, তবু মনে হচ্ছে এটাই সেই সময়। শেষ বিশ্বকাপটি আমার জীবনে অনেক কিছু এনে দিয়েছে। আমাদের স্বপ্ন ছিল আমার এবং পুরো দেশের স্বপ্ন পূরণ করা, আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া।’
সর্বশেষ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে সতীর্থদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান এই কিংবদন্তি, ‘আমরা সবকিছু দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি শারীরিকভাবে আমাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। পায়ে যেমন চাপ পড়েছিল, আবেগের দিক থেকেও ম্যাচটি অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল। আমরা সব সময়ের মতোই এই জার্সির জন্য লড়াই করেছি। আমার পাশে থাকা কোনো সতীর্থ এই জার্সির জন্য সবকিছু উজাড় করে দেয়নি, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা সব সময় নিজেদের সবকিছু দিয়েছে।’
ক্যারিয়ারে সব স্বপ্ন পূরণের সঙ্গী সতীর্থ ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাই। তারাই আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করেছে। তাদের সঙ্গে আমি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন, ফাইনালিসিমা জিতেছি। মাঠের ভেতরে-বাইরে আমার পাশে এমন সব যোদ্ধা ছিল, যারা দলের জন্য জীবন দিয়ে লড়ত। পাশাপাশি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সমর্থকদেরও ধন্যবাদ। যেখানেই খেলেছি, মনে হয়েছে নিজেদের মাঠেই খেলছি।’
মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের আবেগময় স্মৃতি স্মরণ করে মেসি বলেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এই মাঠে প্রথম ম্যাচ খেলা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা ঘটনা। আর আজ একই স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনটি অনুভব করছি, কারণ আজ আপনাদের সবাইকে বিদায় বলছি। এখন থেকে আমিও আপনাদের মতো গ্যালারিতে বসে আর্জেন্টিনার একজন সাধারণ সমর্থক হয়ে জুনিয়রদের সমর্থন করব।’
জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কঠিন সময় আসবে, অবশ্যই আসবে। কারণ এতদিন যা হয়েছে তা স্বাভাবিক বিষয় নয়। বড় লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়, আর সেই কঠিন সময়েই দলের পাশে বেশি করে দাঁড়াতে হবে।’
বক্তব্যের শেষ দিকে তীব্র আবেগ চেপে মেসি বলে ওঠেন, ‘সত্যি বলতে, জীবনে যতটা কথা বলেছি, তার চেয়েও বেশি কথা বলছি আজ। সত্যি হলো, আমি এখান থেকে যেতে চাই না, মাঠ ছাড়তে চাই না। শুধু এটুকু বলতে চাই, আমি আপনাদের ভালোবাসি। আপনাদের মিস করব। স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ যে আমি আর্জেন্টাইন। আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি গর্বিত।’


