অনিয়ন্ত্রিত ফি/ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে লাগাম টানবে কে?

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে লাগাম টানবে কে?
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

সরকারি নীতিমালার অভাব ও তদারকির ঢিলেঢালা সুযোগে লাগামহীন হয়ে পড়েছে দেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। ভর্তি, বেতন আর নানা অজুহাতে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। এমনকি সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করার অভিযোগও উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকরা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তবে ইদানীং মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক সন্তান ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, বোর্ডের থেকে অনুমোদন নেওয়ার পর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আর তেমন যোগাযোগ থাকে না। নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হচ্ছে। তবে গত কয়েক মাস ধরে মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

ফি না দিলে শ্রেণিকক্ষে ঢোকা মানা!

সম্প্রতি ঢাকার গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সময়মতো বেতন দিতে না পারায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। স্কুলের এই সিদ্ধান্তকে ‘চরম স্বেচ্ছাচারিতা’ আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন অভিভাবকরা।

অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতি বছর অন্যায়ভাবে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত টিউশন ফি বাড়ানো হলেও পড়াশোনার মান বাড়েনি। উল্টো এক বছরের বেশি সময় ধরে অধ্যক্ষসহ প্রধান কিছু পদ ফাঁকা পড়ে আছে। চার বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—প্লে-গ্রুপে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ফি ছিল ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। পরের বছর তা প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ টাকা। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে আরও ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৬০ টাকা। আর চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ১১ শতাংশ বাড়িয়ে আদায় করা হচ্ছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫২০ টাকা। রাজধানীর অধিকাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের চিত্রও একই।

তবে গ্লেনরিচের ভর্তি শাখার প্রধান নবমিতা মমতাজ দাবি করেন, ‘মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখেই ফি বাড়ানো হয়। এ বছর মূল্যস্ফীতি বেশি হলেও আমরা বাড়তি ফি ১০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি।’

আর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই মাসের বেতন না দেওয়ায় সফটওয়্যারের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে কার্ড অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। তাই সাময়িক এই সমস্যা তৈরি হয়।

একই চিত্র ‘জাহান ইন্টারন্যাশনাল’ স্কুলেও। প্লে-গ্রুপে গত বছর মাসিক ফি ৪ হাজার টাকা থাকলেও এ বছর নার্সারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার টাকা।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া ‘বিবিধ ফি’ নামে বছরে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই স্কুলের উত্তরা শাখা থেকে টাইমস’কে জানানো হয়, এই টাকা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আউটডোর কার্যক্রমে খরচ করা হয়।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘বোর্ড কেবল শিক্ষার্থীদের ও-লেভেল এবং এ-লেভেলের সনদ সমমান করার কাজ করে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পুরো কার্যক্রম বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় আইনিভাবে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘পড়াশোনার কারিকুলাম বাদ দিলে স্কুল পরিচালনার বাকি সব নিয়মে সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। সরকার চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট ফি কাঠামোও ঠিক করে দিতে পারে।’

পুনঃভর্তি ফি বন্ধের পর নতুন কৌশল

চলতি বছর থেকে স্কুলে পুনঃভর্তি ফি নেওয়া নিষিদ্ধ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এরপর নতুন কৌশলে টাকা আদায় শুরু করেছে অনেক স্কুল। গুলশানের ‘লর্ডস: অ্যান ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল’ ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ‘অ্যানুয়াল ফি’ নামে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা আদায় করেছে। সেই সঙ্গে চতুর্থ শ্রেণির মাসিক বেতন ১৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা কারণ জানতে চাইলেও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট টেইলর থেকে বাড়তি দামে নিম্নমানের ড্রেস কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে স্কুলটির বিরুদ্ধে। অভিযোগের বিষয়ে লর্ডস স্কুলের কার্যালয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও কেউ সাড়া দেয়নি।

একইভাবে নতুন বাজারের পূব দিকে মাদানী এভিনিউ- ১০০ ফিট রোড এলাকার ‘স্যার জন উইলসন স্কুলে’ পুনঃভর্তি ফি না নিলেও বেতন ২ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। সঙ্গে খাতা-কলমসহ যাবতীয় স্টেশনারি জিনিসপত্র স্কুলের নির্দিষ্ট দোকান থেকেই কেনার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খান বলেন, ‘সরকারের আদেশ অনুসারে কোনো স্কুলেই পুনঃভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’

কঠোর নজরদারি জরুরি

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাড়ে তিনশর মতো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে অন্তত তিন লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। চার্জের নামে এসব স্কুলে যে টাকা আদায় করা হয়, কয়েক মাসের হিসাবে তা অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো সেমিস্টার ফি’র চেয়েও বেশি।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, আগে ইংলিশ মিডিয়ামে কেবল ধনী পরিবারের সন্তানরা পড়ত বলে সরকারও বেশি মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এখন সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা আসছে। ফলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থেই এসব স্কুলকে দ্রুত কঠোর নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।

প্রশ্ন তোলায় অভিভাবককে অপমান ও হুমকি

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে অভিযোগ তোলায় গুলশানের ‘ম্যাপল বিয়ার কানাডিয়ান স্কুলের’ প্রধান শিক্ষক রিফাত হায়দারের বিরুদ্ধে এক অভিভাবককে অপমানের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী অভিভাবকের অভিযোগ, ক্লাসে করানো মডেল টেস্ট থেকেই পরীক্ষার প্রশ্ন হুবহু তুলে দেওয়া এবং স্যাঁতস্যাঁতে ক্লাসরুমের পরিবেশ নিয়ে প্রতিবাদ জানানোয় ওই শিক্ষক তার সঙ্গে চরম খারাপ ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলে হুমকি দিয়ে সন্তানকে স্কুল থেকে নিয়ে যেতে বলেন।

অভিভাবক ও প্রধান শিক্ষকের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড টাইমসে’র হাতে এসেছে, যেখানে চরম দুর্ব্যবহারের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে ম্যাপল বিয়ার স্কুলে ফোন করা হলে স্কুলের কোঅর্ডিনেটর সাদিয়া সামাদ জানান, প্রধান শিক্ষক এখন উপস্থিত নেই, পরে কথা বলবেন। তবে এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad