রাষ্ট্র কাঠামোয় বহুত্ববাদের প্রতিফলন নেই: সেমিনারে বক্তারা

রাষ্ট্র কাঠামোয় বহুত্ববাদের প্রতিফলন নেই: সেমিনারে বক্তারা
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

গণঅভ্যুত্থানের পর বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা সামনে এলেও রাষ্ট্রের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রতিফলন নেই বলে মন্তব্য করেছেন লেখক, গবেষক, আইনজীবী ও সাংবাদিকেরা। তাদের মতে, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি এবং পরিচয় নির্ধারণে একক দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রকে বহুত্ববাদ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাংবিধানিক বহুত্ববাদ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। আইপিনিউজ বিডি ও সড়ং রিসার্চ অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বহুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে ছিল না। জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি নারী, কৃষক, শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যের অধিকারও তাঁর চিন্তার অংশ ছিল।

কাপ্তাই বাঁধের বিরোধিতা লারমার কাছে শুধু উচ্ছেদ বা ভূমি হারানোর প্রশ্ন ছিল না উল্লেখ করে পাভেল বলেন, ‘মানুষের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধেও লারমা অবস্থান নিয়েছিলেন। যে কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের উন্নতি সাধিত হচ্ছে, সেই কাপ্তাই বাঁধ এলাকার উচ্ছেদকৃত লোকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এখনো হয়নি। কাপ্তাই বাঁধ আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।’

লারমার কৃষকের জ্ঞানকেও রাষ্ট্রের জ্ঞানের অংশ করার কথা উল্লেখ করে পাভেল প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাদেশের ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কোনো কৃষক নাই কেন?’ তার মতে, জুমচাষ শুধু উৎপাদনব্যবস্থা নয়, এটি জনগোষ্ঠীর জীবন ও পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত।

প্রকৃতি নিয়েও লারমার চিন্তার কথা তুলে ধরে পাভেল পার্থ বলেন, নদী, পাহাড়, বন ও প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষাকে লারমা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। একইসঙ্গে কোরআন ও গীতার পাশাপাশি বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মগ্রন্থ পড়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন।

কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে বহুত্ববাদের ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। তার প্রশ্ন, যারা রাষ্ট্রের পরিবর্তন ও সংস্কারের কথা বলছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব কতটা আছে।

সোহরাব হাসান বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু প্রতিনিধি ছিলেন না। সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে নারী সদস্য থাকলেও ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। তার মতে, বহুত্ববাদের কথা বলা হলেও বাস্তব কাঠামোয় তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

১৯৭২ সালের সংবিধানে দেশের বাসিন্দাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত নয়। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীও ভূমি, বন ও বসতভিটা হারাচ্ছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এসব জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় ও মতামতের প্রতিফলন প্রয়োজন।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর ‘জন-আকাঙ্ক্ষা’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে জানা হচ্ছে এবং কারা সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছেন।

বখতিয়ার আহমেদের মতে, জন-আকাঙ্ক্ষা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে কল্পনা করার বিষয়। এ জায়গায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে দেখলে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না।

কাপ্তাই বাঁধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এর প্রভাব শুধু ভূমি হারানো বা উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণও বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তৃতির উদাহরণ।

বখতিয়ার আহমেদ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে কাল্পনা চাকমার গুমের প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর মতে, এ ঘটনাকে ঘিরে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জনগণের সম্পর্ক নিয়ে আরও গভীরভাবে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ‘প্রকাশ্য সত্য’ ও ‘গুপ্ত সত্য’ আলাদা করে দেখার প্রবণতাও বুঝতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, রাষ্ট্রচিন্তায় নারীর অংশগ্রহণ ও অধিকারকে দৃশ্যমান করা জরুরি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলেছেন, যা বর্তমান সংবিধানের বৈষম্যবিরোধী নীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সারা হোসেন বলেন, ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতি সংবিধানে রয়েছে। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু বাস্তবে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এসব ব্যবস্থাকে কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নতুন করে ভাবতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদে বহুত্ববাদের বিষয়টি এসেছে। তবে বৈষম্যবিরোধী কাঠামোর সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক সাখাওয়াত টিপু রাষ্ট্রে ভাষার বৈচিত্র্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, চাকমা, মারমাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে সমান মর্যাদা না দিলে তাদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য বৃহত্তর সমাজে যথাযথভাবে পৌঁছাবে না।

সাখাওয়াত টিপু বলেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়েরও বাহন। তাই রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী কাঠামোয় ভাষার বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের অপরাপর জনগোষ্ঠী, অপরাপর ধর্মীয় সম্প্রদায় যদি সুখে না থাকে, তাহলে প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় সুখে থাকতে পারে না।’ তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানদণ্ড হলো সব জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সেমিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসাসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad