শিক্ষা খাতের সাফল্য এখন উল্টো পথে

শিক্ষা খাতের সাফল্য এখন উল্টো পথে
কার্টুন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

টানা ১৪ বছরের ধারাবাহিক অগ্রগতির পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, উচ্চমাধ্যমিকে বিপুল আসন ফাঁকা থাকা এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী না পাওয়া–সব মিলিয়ে পুরো শিক্ষা খাতে সংকট গভীর হচ্ছে।

মারাত্মক শিক্ষক সংকট, পেশাগত অসন্তোষ, ক্লাসে ব্যাপক অনুপস্থিতি, নৈতিকতা ও দক্ষতার অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষা দর্শনের ক্রমাগত পরিবর্তনের ফলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

এমন এক পটভূমিতে বৃহস্পতিবার সারা দেশে পালিত হচ্ছে শিক্ষা দিবস। পাকিস্তানি শাসনামলে শিক্ষা বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে এই দিবসের সূচনা। ছয় দশক পার হলেও শিক্ষা খাতের মৌলিক উদ্বেগগুলো থেকেই গেছে।

টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে নটর ডেম কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এ এন রাশেদা দাবি করেন, শিক্ষাকে কখনোই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাকে কখনোই একাডেমিক দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। বরং মূল অংশীদারেরা কেবল ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের দিকে নজর দিয়েছে। এই অবক্ষয় পুরো খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, শিক্ষার্থীদের নৈতিক পতন ঘটিয়েছে, ফলে তৈরি হচ্ছে মূল্যবোধহীন নাগরিক।’

শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা এবং শিক্ষকদের অপেশাদার আচরণের জন্য তিনি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শিক্ষকদের বেতনের অর্থ আটকে রেখে তা খরচ না করেই ফেরত পাঠিয়েছেন।’ তথাকথিত বাজেট সংকট সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথ আটকে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

এ এন রাশেদা বলেন, ‘মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া আমরা আদর্শ নাগরিক তৈরি করতে পারব না।’

প্রাথমিকে বাড়ছে ঝরে পড়া

টানা ১৪ বছর কমার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান (এপিএসএস) ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছেলেদের ঝরে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি—১৪ দশমিক ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ হয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রাথমিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালেও এই ধারা অব্যাহত আছে।

এপিএসএস জানায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এর অন্যতম কারণ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় উপবৃত্তির টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে টানাটানির সংসারে অনেক পরিবার ছেলেকে শিশুশ্রমে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, আর বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে কিছু মেয়ে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষাবিদ রাশেদা বলেন, শুধু বিনামূল্যে বই দেওয়াই মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না। শিক্ষকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন-ভাতা, নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ঠিকাদারদের হাতে দায়িত্ব না দিয়ে জাপান ও চীনের মতো সরাসরি স্কুলের ব্যবস্থাপনায় দুপুরের খাবার রান্নার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, বেসরকারি ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের লাভের সুযোগ দিলে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সততা নষ্ট হয়।

আরও পড়ুন

সংকটে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাও তীব্র সংকটে পড়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হতে গেলেও কলেজগুলোর অন্তত ৬০ শতাংশ আসন খালি পড়ে রয়েছে।

সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ আসন থাকলেও এবার মাত্র ৯ লাখ ৯৫ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদন করেছে। উল্লেখ্য, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১১ লাখ ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদনই করেনি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকতারুজ্জামান এই শূন্যতার জন্য দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং ক্লাসে অনুপস্থিতিকে দায়ী করেন।

তিনি বলেন, ‘এ বছর এসএসসিতে ৩৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের অবহেলা ও শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতির চরম পরিণতি। শিক্ষাকে যে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার ছিল, সরকার তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।’

উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যারা আবেদন করেনি, তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা হয়তো কারিগরি বা ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হচ্ছে।

অধ্যাপক আকতারুজ্জামান বলেন, ‘যদি তাই হয়, তবে এটি ইতিবাচক। বাকিরা আবেদনের ভুলের কারণে সুযোগ হারিয়েছে, তাদের দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া হবে।’

কারিগরিতে শিক্ষার্থী টানতে হিমশিম

কারিগরি শিক্ষায় এক বৈপরীত্যমূলক সংকট দেখা দিয়েছে: অবকাঠামো ও আসন বাড়লেও শিক্ষার্থী ভর্তির হার পিছিয়ে আছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৪৯টি চালু থাকা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার আসনের মধ্যে ৬৩ শতাংশ বা ৯৭ হাজার আসন খালি রয়ে গেছে।

নির্মাণাধীন আরও ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান চালু হলে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ২ লাখ ৮৫ হাজার। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেবল ভবন বা প্রতিষ্ঠান বাড়ালেই কি শিক্ষার্থী বাড়ানো সম্ভব?

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক (কারিকুলাম) প্রকৌশলী অনিমেষ পাল জানান, সরকারি ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে এখনো চাহিদা রয়েছে। সেখানে ২৬ সেপ্টেম্বরের ভর্তিকে সামনে রেখে ৪০ হাজার আসনের বিপরীতে ৭০ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। তবে চরম সংকটে আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

কারিগরি শিক্ষায় অনাগ্রহের জন্য শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের মানসিকতার পরিবর্তনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাতে-কলমে শেখার আগ্রহ কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা কোনো দক্ষতা অর্জন ছাড়াই কেবল সার্টিফিকেট পেতে চায়।’

কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আজহারুল হক সেকেলে সুযোগ-সুবিধা ও দুর্বল শিক্ষাদান পদ্ধতিকে মূল কারণ মনে করেন। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক কারখানার যন্ত্রপাতি নেই। আমরা নিম্নমানের প্রশিক্ষণ দিয়ে উচ্চমানের চাকরির প্রত্যাশা করছি, যা শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে।’

সরকার বদলালেই বদলে যায় নীতি

পরিসংখ্যানের বাইরে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ব্যর্থতা হলো–স্থায়ী ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য কোনো জাতীয় শিক্ষা রূপরেখার অভাব।

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং কারিগরি, বিজ্ঞান ও নারী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এই নীতির বাস্তবায়ন থমকে যায়।

পরবর্তী সরকারগুলো আরও সাতটি কমিশন গঠন করে। কিন্তু স্থায়ী ঐকমত্য তৈরির বদলে তারা মূলত কুদরাত-ই-খুদার রূপরেখাকে নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে, যা এই খাতকে দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনাহীন করে তুলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নন-ফরমাল অ্যান্ড লাইফলং এডুকেশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার মূল দর্শন পরিবর্তিত হয়।

ভারতের ধারাবাহিক জাতীয় শিক্ষা কাঠামোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার রদবদল হলেই সরকারগুলোর শিক্ষার মূল দর্শন বদলে ফেলা উচিত নয়।’

নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে তিনি অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও গবেষণাভিত্তিক ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করেন।

স্থায়ী নীতি ছাড়া হুটহাট স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বা জাতীয়করণের বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।

সবশেষে নাগরিক তদারকির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগে’র (সিপিডি) মতো শিক্ষা খাতে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা দরকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর