সিলেট বিএনপির কোন্দল প্রকাশ্যে

সিলেট বিএনপির কোন্দল প্রকাশ্যে
Advertisement
Advertisement

সিলেটে বিএনপির দীর্ঘদিনের চেপে রাখা অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উপদলীয় বিরোধ আবারও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বুধবার রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফরকালে তার সম্মানে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বয়কট করেছে দলের একটি প্রভাবশালী অংশ।

বাইরে থেকে দলকে ঐক্যবদ্ধ দেখানোর চেষ্টা থাকলেও, এই বয়কটের ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং প্রশাসনিক পদগুলোতে নিজস্ব বলয়ের নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া গভীর অসন্তোষকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই নাগরিক সংবর্ধনায় কেন্দ্রীয়, জেলা ও নগর বিএনপির একাংশ অংশ নিলেও অন্য একটি বড় অংশ বর্জন করে। বর্জনকারী অংশের অভিযোগ, সংবর্ধনা আয়োজনের পুরো পরিকল্পনা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী একক সিদ্ধান্তে সব কিছু পরিচালনা করেছেন বলে তাদের দাবি।

নগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, এর আগে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও সিলেটের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকে সংবর্ধনা আয়োজনের জন্য সর্বস্তরের অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক কমিটি গঠন করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই কমিটি গঠন না করেই সিটি করপোরেশন এককভাবে পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করে। ক্ষুব্ধ নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার কারণ জানাতে সার্কিট হাউসে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফর ও সঙ্গে বিএনপির নেতারা। ছবি: টাইমস

দলীয় সূত্র জানায়, সিলেটের বিএনপিতে এই মুখোমুখি অবস্থান নতুন কিছু নয়। গত আগস্ট থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এর আগে ২৫ আগস্ট সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এড়িয়ে যান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী।

আরও পড়ুন

আবার ১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের উপস্থিতিতে মহানগর বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধনের সময় অতিথির তালিকা থেকে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে বাদ দেওয়া হয়।

সিলেট বিএনপিতে এই উপদলীয় রাজনীতির শিকড় মূলত ১৯৯০-এর দশকে। সেসময় থেকে খন্দকার আবদুল মালিক, এম সাইফুর রহমান এবং পরবর্তীতে নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পৃথক বলয়গুলোকে ঘিরে দলীয় বিভাজন স্থায়ী রূপ নেয়।

বর্তমানে সেই বিভাজন মূলত বিএনপির চেয়ারম্যানের দুই উপদেষ্টা বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে রূপ নিয়েছে।

সিলেট-১ আসনে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদিরের মনোনয়ন পাওয়া এবং পরবর্তীতে প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে তার অনুসারীদের পদায়নকে কেন্দ্র করে এই অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। কাইয়ুম চৌধুরী, কয়েস লোদী, জেলা পরিষদ প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, ওয়াসা চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী ও জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক বদরুজ্জামান সেলিমের মতো প্রভাবশালী পদগুলোতে মুক্তাদিরপন্থীদের প্রাধান্য স্পষ্ট।

সিলেট-৪ আসন থেকে নির্বাচিত আরিফুল হক চৌধুরীর সমর্থকরা অভিযোগ করছেন, দল ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে কোণঠাসা ও অবমূল্যায়িত করে রাখা হয়েছে।

এই সংঘাতের পেছনে মূল কারণ আগামী সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া ও স্থানীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার লড়াই। তবে রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা বর্জনকারীদের মধ্যে মুক্তাদিরের নিজস্ব বলয়ের কিছু নেতার উপস্থিতিও দেখা গেছে, যা মন্ত্রীর নিজস্ব শিবিরের ভেতরের উপদলীয় সমীকরণ প্রকাশ করেছে।

তবে দলীয় বিভাজনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন নগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেন। তিনি দাবি করেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে নগর বিএনপি অনেক বেশি সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ। সব স্তরের নেতাকর্মীদের নিয়মিত কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তারা অংশগ্রহণ করেন।

অন্যদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউস স্বীকার করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার পর নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ও দাবি বহুগুণ বেড়েছে। তবে বিরোধী দলে থাকার সময় যেসব নেতাকর্মী মাঠে থেকে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে যথাসময়ে মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর