সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে হাইব্রিড শসা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তুলনামূলক কম সেচ, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, রোগ-পোকার আক্রমণ কম হওয়া এবং বেশি ফলন পাওয়ায় দিন দিন এ পদ্ধতিতে শসা চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
উপজেলার নলকা ইউনিয়নের নলকা ঝাঁকরি গ্রামের কৃষক মো. হাফিজুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের শসা চাষ করেছেন। চাষের মাত্র ৩৫ দিনেই তার জমি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ মণ শসা উঠেছে। বর্তমানে তিনি পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি শসা ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এ আবাদে এখন পর্যন্ত তার প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
কৃষক মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, ৬০ শতাংশ জমিতে বেড তৈরি করে মালচিং পদ্ধতিতে শসা আবাদ করেছেন। গত বছর প্রচলিত পদ্ধতিতে শসা চাষ করেছিলেন। তার অভিজ্ঞতায়, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় মালচিং পদ্ধতিতে উৎপাদন বেশি হয়েছে এবং খরচও তুলনামূলক কম। তাকে দেখে আশপাশের অনেক কৃষকও এখন এ পদ্ধতিতে শসা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
মালচিং পদ্ধতিতে বেড তৈরি করে জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের পর জমি কালো ও রূপালি রঙের মালচিং শিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘসময় ধরে রাখা যায় এবং আগাছার বৃদ্ধি কমে। ফলে সেচের প্রয়োজন কম হয় এবং রোগ-পোকার আক্রমণও তুলনামূলক কম দেখা যায়। গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠার পাশাপাশি ফলনও বাড়ে।
শসা গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁশ ও নাইলন জাল দিয়ে মাচা তৈরি করে লতা তুলে দিলে ফল মাটির সংস্পর্শে আসে না। এতে ফল পরিষ্কার থাকে এবং পচে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ও কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে রোগ-পোকা দমনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হাফিজুল ইসলাম ৫৭৭, জয়েন্ট, থাইল্যান্ড ওয়ান ও রেনেসাঁ জাতের শসা চাষ করেছেন। শসার পাশাপাশি তিনি ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু ও মুলাও চাষ করেন। তবে কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহায়তা বা সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নলকা ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কৃষকদের সবসময় খোঁজখবর নিয়ে থাকি। কৃষকের অভিযোগের বিষয়ে তিনি আমাকে জানাননি। তিনি যদি আমাকে না জানান, তাহলে তিনি কী আবাদ করেছেন বা কী সমস্যায় আছেন, সেটা কীভাবে জানব। কৃষকরা তাদের আবাদ ও সমস্যার কথা জানালে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করি। মালচিং পদ্ধতি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অংশ। এ পদ্ধতিতে শসা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে আমরা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি প্রদর্শনীর মাধ্যমে মালচিং পদ্ধতিতে শসা চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। চলতি বছর উপজেলায় ৬০ শতাংশ জমিতে প্রদর্শনী হিসেবে মালচিং পদ্ধতিতে শসা আবাদ করা হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৪৫ মণ পর্যন্ত শসা উৎপাদন হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১২ হেক্টর জমিতে শসা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মালচিং পদ্ধতিতে সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, এবছর ১৩০ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন শসা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা অধিক লাভের আশায় উচ্চমূল্যের ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। শসা একটি উচ্চমূল্যের সবজি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের ফসল চাষ করলে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো ফলন ও বাজারমূল্য পেতে পারেন। কৃষকদের চাহিদা ও স্থানীয় আবহাওয়া বিবেচনায় উপযোগী জাত নির্বাচন, সঠিক জমি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক জাত নির্বাচন, উন্নত জমি প্রস্তুতি, মালচিং শিট, মাচা এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার করলে শসা চাষে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফলন বাড়ানো সম্ভব।


