আমের মূল মৌসুম শেষ হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কানসাট আম বাজারে কর্মচাঞ্চল্য ও ব্যস্ততা কমেনি। স্বাভাবিক সময়ের মৌসুমি আমের সরবরাহ ফুরিয়ে এলেও আশ্বিনা, বারি-৪, গৌড়মতি, খিরসাপাত, কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোর মতো নাবি (দেরিতে পাকে) ও বারোমাসি জাতের আমে এখনো জমজমাট জেলার বৃহত্তম এই আম বাজার।
প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার মণ আম বেচাকেনা হচ্ছে। মৌসুমের শেষ সময়ে নাবি জাতের আম ঘিরে বাজারের এমন বেচাকেনা চাষি ও ব্যবসায়ীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বর্তমানে কানসাট বাজারে নাবি ও বারোমাসি জাতের আম বেশ ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে আশ্বিনা আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বারি-৪ ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, গৌড়মতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, কাটিমন ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে মণ হিসেবে কিনলে দাম কিছুটা কম পড়ছে।
বাজারে কাটিমন আম নিয়ে আসা চাষি আশরাফুল ইসলাম জানান, মৌসুমের শেষ মুহূর্তে কাটিমন আম প্রতি মণ ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় সন্তোষজনক।
একই অভিজ্ঞতা জানিয়ে চাষি আবদুস সালাম বলেন, প্রতি মণ বারি-৪ আম ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ৮ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। দরদামের কারণে দাম সামান্য কমাতে হলেও মৌসুমের শেষে নাবি জাতের ভালো দাম পাওয়ায় চাষি, পাইকার ও ক্রেতা—তিন পক্ষই সন্তুষ্ট।
তবে বাজারে আম বেচাকেনার এই উৎসবের মাঝেও কিছুটা উদ্বেগের কথা জানান কানসাটের অনলাইন আম ব্যবসায়ী মো. ওয়ালিদ। তার মতে, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও বাগান পরিচর্যার ব্যয় অনেক বাড়লেও সব জাতের আমের দাম সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাজারে বিপুল পরিমাণ আম হাতবদল হলেও উৎপাদনকারীদের হাতে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থাকছে না। এই পরিস্থিতির কারণে চাষিরা জাত নির্বাচনে পরিবর্তন আনছেন এবং ভালো লাভের আশায় কাটিমন ও গৌড়মতির মতো নাবি জাতের দিকে ঝুঁকছেন।
শিবগঞ্জের আমচাষি ইসমাইল হোসেন খান জানান, জেলার অন্য চার উপজেলার সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও শিবগঞ্জে বেশি আম হয়। একসময় এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ বাগানে ফজলি আমের চাষ থাকলেও বর্তমানে তা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। চাষিরা নতুন জাতের দিকে ঝুঁকছেন।
নাবি জাতের এই সাফল্যের পাশাপাশি চাষিদের সামনে এসেছে আরও এক চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় সম্ভাবনা—অসময়ে জিআই স্বীকৃত খিরসাপাত (হিমসাগর) আমের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ। সাধারণত মে-জুন মাসে বাজারে আসা খিরসাপাত আম আগস্ট মাসে গাছে ধরিয়ে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন শিবগঞ্জের কয়েকজন চাষি।
শিবগঞ্জের আড়গাড়া গ্রামের আমচাষি গোলাম মোস্তফা জানান, মৌসুমি খিরসাপাত গাছের জাত পরিবর্তন করতে তিনি কাটিমন আমের ডাল গ্রাফটিং (কলম) করেছিলেন। কলমের পর দেখা যায়, নতুন ডালে কাটিমন এলেও পুরোনো অংশে অসময়ে মুকুল আসে। পরিচর্যা শেষে সেই ডালে খিরসাপাত আমের ফলন হয়। অসময়ের এই খিরসাপাত আম তিনি বাগান থেকেই প্রতি মণ প্রায় ২৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন এবং ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ হাজার টাকার আম বিক্রি করেছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে ভাঙাব্রিজ এলাকার আমচাষি সজিব আলীর বাগানেও, যেখানে কাটিমনের পাশাপাশি অসময়ে খিরসাপাত ঝুলতে দেখে ক্রেতারা বাগান থেকেই ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
শিবগঞ্জ ম্যাঙ্গো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, ভরা মৌসুমে খিরসাপাত আম কখনো কখনো মাত্র ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। কিন্তু অসময়ের সেই আমের দাম পাওয়া যাচ্ছে কয়েকগুণ বেশি। এক গাছে কাটিমন গ্রাফটিং করে খিরসাপাত ও কাটিমন দুই-ই পাওয়ার এই পদ্ধতিটি বাণিজ্যিক রূপ পেলে আম অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।
তবে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে কতটুকু টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর, সে বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, বিষয়টি এখনো বিস্তারিত গবেষণার অপেক্ষায় রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। মৌসুমের শেষ দিকে এসেও নাবি জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত আছে।
ঢাকা থেকে আম কিনতে আসা শফিকুল ইসলামের মতে, মৌসুমের বাইরে খিরসাপাত উৎপাদনের এই সাফল্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল মৌসুমের কয়েক মাসের ওপর নির্ভর না করে নাবি জাতের প্রসার, আম সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় হবে। তাই এবারের মৌসুম শেষের কানসাট বাজার কেবল আম বিক্রির শেষ অধ্যায় নয়, বরং আমচাষের বদলে যাওয়া রূপ ও নতুন সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।


