মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা একটি সুপরিচিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি প্রদান, স্বীকৃতি প্রদান ও নবায়ন, বিভিন্ন অভিযোগ নিষ্পত্তি, কমিটি গঠনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষকরা এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করেন এবং অনেক সময় নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। কিন্তু শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সাধারণত কোনো অভিযোগ আসে না। কারণ, শিক্ষকরা কোনোভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারলে মনের কষ্ট মনেই রাখেন। আবার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অনেক কিছু এড়িয়ে যান। কারণ, ভবিষ্যতে তাদের আবারও এই প্রতিষ্ঠানে আসতে হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম, বিদ্যমান সমস্যা এবং এর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আমার কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরছি।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে। এটি পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি, সরকারি বা আধাসরকারি—কোন শ্রেণির প্রতিষ্ঠান, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই পরিষ্কার ধারণা নেই। ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রায় ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে একটি রায়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক প্রকৃতি ও আইনগত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। তারপরও বিষয়টি সাধারণের কাছে সহজবোধ্য নয়।
আপনি যদি কাউকে প্রশ্ন করেন—“ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সরকারি, বেসরকারি নাকি অন্য কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান?”—অনেক ক্ষেত্রেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারবেন না।
মূলত শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত হচ্ছে নিজস্ব অর্গানোগ্রাম, বিধিবিধান এবং সরকারি নির্দেশনার সমন্বয়ে।
কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদগুলো—যেমন চেয়ারম্যান, সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিদ্যালয় পরিদর্শক, কলেজ পরিদর্শকসহ আরও কিছু প্রথম শ্রেণির পদে—সাধারণত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে অন্যত্র চলে যান। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বিধি অনুযায়ী অধিকাংশ কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়।
সরকারি প্রেষণে আসা কর্মকর্তা ছাড়া বিপুলসংখ্যক কর্মচারী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ পান। সাধারণত ১৫ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা এখানে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। পরবর্তীকালে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও শূন্যপদ সাপেক্ষে তারা বিভিন্ন পদে পদোন্নতি পেয়ে উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সমমানের পদে উন্নীত হন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করা যায়—এসব কর্মচারীর চাকরিজীবনে সাধারণত বদলির সুযোগ থাকে না। ফলে তারা দীর্ঘদিন, এমনকি পুরো চাকরিজীবন একই প্রতিষ্ঠানে কাটিয়ে দেন। পাশাপাশি পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও শূন্যপদকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়; অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা যোগ্যতা যাচাইয়ের অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা থাকে না।
অথচ এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় এক্সটার্নাল বা ভিজিল্যান্স টিমের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবেও তারা দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি, স্বীকৃতি প্রদান ও স্বীকৃতি নবায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তারা পরিদর্শনেও অংশ নেন।
এখানে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের একটি শক্তিশালী পেশাজীবী সংগঠনও রয়েছে, যা অনেকটা সিবিএ-ধাঁচের সংগঠনের মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
এত কথা বললাম কেন?
শিক্ষা বোর্ডে প্রতিনিয়ত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়। কেউ বলতে পারেন—অনিয়ম ও দুর্নীতি তো সব জায়গাতেই কমবেশি রয়েছে; শিক্ষা বোর্ডেও যদি কিছু থাকে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যাটি হলো, এখানে দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার ফলে একটি বিশেষ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বলয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো বদলি না থাকায় একধরনের একচ্ছত্র প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের বিকাশ ঘটতে পারে। সরকারি চাকরিতে বদলি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একঘেয়েমি দূর করা, কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।
কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তি একই দায়িত্বে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি তার কাছে অনেকটা নিজের প্রতিষ্ঠানের মতো হয়ে উঠতে পারে। তখন অনিচ্ছাকৃতভাবেও স্বেচ্ছাচারিতা, প্রভাব বিস্তার কিংবা জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, বদলির সুযোগ না থাকলে প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস বা শাস্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রেও যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাছাই করার কার্যকর পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও শূন্যপদের ওপর নির্ভর না করে দক্ষতা, কর্মদক্ষতা, সততা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কর্মচারীদের শক্তিশালী সংগঠন থাকা তাদের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার। তবে কোনো সংগঠন যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ কিংবা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে অযাচিত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসন ও স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে প্রশাসন স্বাধীনভাবে ও স্বাচ্ছন্দ্যে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
আমার প্রস্তাবনা
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডসহ দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে—
১. শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো ও আইনগত অবস্থান আরও সুস্পষ্ট করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
২. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বচ্ছ ও কার্যকর বদলি ব্যবস্থা চালু করা। অন্তত আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পারস্পরিক বদলি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
৩. দীর্ঘদিন একই পদে বা একই দায়িত্বে কর্মরত থাকার সুযোগ সীমিত করে নির্দিষ্ট সময় পর দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা।
৪. পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নয়; কর্মদক্ষতা, সততা, দক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে মূল্যায়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা।
৫. গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাভিত্তিক বাছাই নিশ্চিত করা।
৬. শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রশাসনিক তদারকি ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা।
৭. অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, যাতে একজন শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান তাদের অভিযোগের অগ্রগতি অনলাইনে জানতে পারেন।
৮. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, স্বীকৃতি প্রদান, স্বীকৃতি নবায়ন ও পাঠদানের অনুমতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
৯. কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যেন দীর্ঘদিন একই ধরনের সংবেদনশীল দায়িত্বে থেকে ব্যক্তিগত প্রভাববলয় তৈরি করতে না পারেন, সে বিষয়ে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধি করা।
১০. শিক্ষা বোর্ডের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নথিভুক্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
শিক্ষা বোর্ড দেশের শিক্ষা প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সরাসরি জড়িত। তাই শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামো যত বেশি স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক হবে, শিক্ষাসেবার মানও তত বেশি উন্নত হবে।
আমার বিশ্বাস, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডসহ দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে কার্যকর বদলি ব্যবস্থা, যোগ্যতাভিত্তিক পদোন্নতি, শক্তিশালী প্রশাসনিক তদারকি, ডিজিটাল সেবা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
( এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব। লেখক: অধ্যক্ষ আবুল বাশার হাওলাদার, সভাপতি, বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়ন)


